আমার মনে হলো উনি মানুষ নন, স্বর্গীয় কোনো দেবতা: মোহাম্মদ মহিউদ্দিন

mohiuddin1234

১৭ আগস্ট ২০১৬ (মুন্সিগঞ্জ নিউজ ডটকম) : মুন্সিগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন। মুন্সিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। পাকিস্তন পর্বের শেষ তিন বছর আওয়ামী লীগের হয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখতেন। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমে প্রধানমন্ত্রী, পরে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তার সরকারি দায়িত্ব পান। প্রায় সাত বছর বঙ্গবন্ধুকে খুব কাছে থেকে দেখেছেন। সেই সময়ের অনেক কথা তিনি ১০ আগস্ট ঢাকাটাইমসকে অকপটে বলেছেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত জীবনের নতুন কিছু দিক উন্মোচন করেছেন। আজ সাক্ষাৎকারের প্রথম কিস্তি ছাপা হলো। মুন্সিগঞ্জ গিয়ে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তায়েব মিল্লাত হোসেন।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রথম দেখা কিভাবে?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : আমি যখন স্কুলছাত্র তখন একবার ময়মনসিংহ গিয়েছিলাম। আমার ভগ্নিপতি এম আর খান সাহেব সেখানে থাকতেন। ওই সময়ে বঙ্গবন্ধু জনসভা করতে সেখানে এসেছিলেন। আমি ছোটবেলা থেকেই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধুর ভক্ত। তাই সেই জনসভায় ছুটে যাই। ওখানেই প্রথম বঙ্গবন্ধুকে সচক্ষে দেখলাম। তারও কয়েক বছর পরে ১৯৬৬ সালের দিকে বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ছয় দফা দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। এই জন্য বঙ্গবন্ধুকে জেলে দেয়। পর্যায়ক্রমে আরও অনেক জাতীয় নেতাকে আটক করে জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এ পর্যায়ে আন্দোলন কিছুটা থেমে যায়। আমি তখন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র। ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত। আমাদের নেতা ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ ও সিরাজুল আলম খান। আন্দোলন-সংগ্রাম নিয়ে পরামর্শ করতে প্রায়ই তারা রাজবন্দি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে জেলখানায় যেতেন। তাদের কাছেই কোনো কারণে ছয় দফার আন্দোলনে আমার সক্রিয়তার কথা জানতে পারেন বঙ্গবন্ধু। আমাকে একদিন নিয়ে যেতে বললেন। নেতারা আমাকে নিয়ে গেলেন রাজবন্দি বঙ্গবন্ধুর কাছে। নেতাদের সঙ্গে আলোচনার ফাঁকেই বঙ্গবন্ধু আমাকে লক্ষ্য করে কিছু কথা বললেন। কিছু পরামর্শ দিলেন। তাঁর আচরণে-উপদেশে বঙ্গবন্ধুর প্রতি আমার ভক্তি-শ্রদ্ধা আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হলেন কখন?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : ১৯৬৬ সালের ছয় দফার পর কয়েক বছর গেল। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হলো। ১৯৬৯ সালে ১১ দফা প্রণয়নের মাধ্যমে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়, উত্তাল আন্দোলন শুরু হয়। গণঅভ্যুত্থানে আইয়ুব খান পদত্যাগে বাধ্য হলেন। জনরোষের কারণে বঙ্গবন্ধুর মামলা প্রত্যাহার করা হয়, তিনি মুক্তিলাভ করেন। এসব আন্দোলনে আমি সক্রিয় ছিলাম।

জেল থেকে বের হওয়ার পর থেকেই বঙ্গবন্ধু আমাকে তাঁর কাছে রেখে দেন। তখন যদিও ইকবাল হলে থাকি (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল)। তবে মিছিল-মিটিংয়ে বঙ্গবন্ধুর পাশেপাশেই থাকতাম। ১৯৭০-এর নির্বাচনি প্রচারণায় সারা দেশে, বিভিন্ন জেলায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গিয়েছি। আমি ওনার সঙ্গেই থাকতাম। যেখানেই যেতেন আমাকে নিয়ে যেতেন। এই সময়ে কর্মতৎপরতা বেড়ে গেলে বঙ্গবন্ধু আমাকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসভবনে নিচের তলায় একটি রুমে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। তখন থেকেই ৩২ নম্বরের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যাই। তখন থেকেই আমি বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তার বিষয়গুলো দেখতাম।

ঐতিহাসিক সাতই মার্চের ভাষণের মঞ্চে বঙ্গবন্ধুর ঠিক পেছনেই আপনাকে দেখা যায়। এ বিষয়টি কেমন লাগে?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব আসলে তখন বুঝতে পারিনি। বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিচ্ছেন, আমি পেছনে দাঁড়িয়ে শুনছি। তাঁর কথাগুলোর দিকেই আমার মনোযোগ ছিল। ভাষণের সময় তিনি অনর্গল কথা বলছেন। ভবিষ্যতের দিনগুলোয় কী করতে হবে, তিনি আজই তা বলে দিচ্ছেন। আমার মনে হলো উনি মানুষ নন, স্বর্গীয় কোনো দেবতা এসব কথা বলছেন। তিনি জনতার উদ্দেশে বললেন ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। আমি যদি হুকুম দিবার না পারি’ পরে কিন্তু এই ভবিষ্যদ্বাণীই বাস্তব হয়েছিল।
এত কাছে থেকে এই ভাষণ শোনার গুরুত্ব ও গভীরতা বুঝতে আমার কয়েক বছর সময় লেগেছে। এখন সাতই মার্চ সম্পর্কে জানতে গবেষকরা, সাংবাদিকরা আমার কাছে আসে। লোকজন বলে, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের ইতিহাস, আপনি তার সাক্ষী।

কেউ কেউ বলতে চান, সাতই মার্চের ভাষণ কোনো নেতা, কোনো ছাত্রনেতা লিখে দিয়েছেন, পরামর্শ দিয়েছেন, এ বিষয়ে কী বলবেন?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : মার্চ মাসে অসহযোগ আন্দোলন চলছে, চারদিকে উত্তপ্ত পরিবেশ। সকলের দৃষ্টি বঙ্গবন্ধুর দিকে। সাতই মার্চ নেতা বাঙালি জাতিকে দিকনির্দেশনা দিবেন। সকাল থেকে তিনি বাসায় স্বাভাবিক অবস্থায় থাকলেও পায়চারি করছিলেন। তিনটার দিকে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিতে যাবেন। তার আগ মুহূর্তে প্রথম সারির কয়েকজন ছাত্রনেতা বঙ্গবন্ধু ভাষণে কী বলবেন, তা নিয়ে পরামর্শ করতে এসেছিলেন। সিরাজুল আলম খানও ছিলেন। নেতা ভাষণে কী বলবেন এ বিষয়ে তিনি এটাসেটা বলছিলেন। তিনি বললেন, আপনি আজকে স্বাধীনতা ডিক্লেয়ার করে দেন। একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু তাকে ধমক দিয়ে বললেন, বঙ্গবন্ধু যদি কারও বুদ্ধি-পরামর্শ নিয়ে ভাষণ দিতেন তাহলে এভাবে ধমক দিতেন না।

সাতই মার্চের ভাষণ নিয়ে গত কয়েক বছর অনেক বিতর্ক হলো। এ নিয়ে কী বলবেন?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : বিএনপি আমাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি ছড়াতে চায়, অনেক মিথ্যাচার করে। কিন্তু এ কে খন্দকার কেন অবাস্তব কথা বললেন, তা আমার মাথায় আসে না। তিনি বিএনপির অবস্থানে কেন, আসলে তার ভিমরতি হয়েছে। সাতই মার্চের ভাষণ পুরো রেকর্ড আছে, তা শুনলেই সব পরিষ্কার হয়ে যায়। ভাষণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমি পেছনে ছিলাম। সেখানে ‘জয় পাকিস্তান’ বা ‘জিয়ে পাকিস্তান’ এমন কোনো কিছু ছিল না। ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাংলার মানুষের প্রতি পাকিস্তানি শাসকদের ২৩ বছরের অত্যাচার-জুলুম, বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরেছেন। এরপর আবার তিনি পাকিস্তানের জয়গান কেন গাইবেন?

২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তারের সময় আপনি কোথায় ছিলেন?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : ২৫ মার্চ রাতে আমি বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়িতেই ছিলাম। সন্ধ্যার দিকে বাসায় উপস্থিত লোকদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘বাসায় যে কোনো সময় পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ করতে পারে। তোমরা এখানে থেকো না।’ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মতো সব কর্মী নিজ নিজ বাসায় চলে গেল। আমি ও বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী হাজী গোলাম মোরশেদ বাড়িতে থেকে গেলাম। বঙ্গবন্ধু আবার আমাদের বললেন, ‘আমার সঙ্গে মরে লাভ কী? বাইরে থাকলে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দেশকে মুক্ত করতে পারবে।’

তবু আমরা দুজন থেকে গেলাম। বাসার নিচতলায় অফিস রুমে আমরা বসেছিলাম। বিভিন্ন স্থান থেকে ফোন আসছে। লোকজন জানতে চাইছে বঙ্গবন্ধু কোথায়, কী অবস্থায় আছেন? রাত ১২টার দিকে শেষ ফোন এলো। আমিই ফোন ধরলাম। প্রফেসর ডা. বি. চৌধুরীর বাবা মো. কফিলউদ্দিন চৌধুরী সাহেব ফোনে জানতে চাইলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর কি অবস্থা?’ আমি বললাম,‘বঙ্গবন্ধু বাসায় আছেন।’ এই কথা শুনে তিনি বললেন, ‘জানতে পারলাম বঙ্গবন্ধুর বাসায় হামলা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাহলে কী এসব মিথ্যা কথা?’ তার কথার সময়েই বাইরে গাড়ি ও গুলির শব্দ শোনা গেল। লোকজনেরও চিৎকার শুনতে পেলাম।

‘বাড়িতে হামলা শুরু হয়ে গেছে’- এ কথা বলেই আমি ফোন রেখে দিলাম। দোতলায় গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে জানালাম পাকিস্তানি বাহিনি এসেছে। এই খবর দিয়ে নিচে নামার সঙ্গে সঙ্গে হানাদাররা আমার উপর হামলা শুরু করল। নির্যাতনের একপর্যায়ে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলার ভান করালম। ওরা তখন বলল,‘শালা মর গেয়া’। তারপর আমার চুল ধরে, পা ধরে টেনেহিঁচড়ে ঘরের কোণায় ফেলে রাখল। হানাদাররা রিসিপশন রুমে মোরশেদ সাহেবকে পেয়ে পিটাতে শুরু করে। কাজের ছেলে আবদুল রান্নাঘরের স্টোর রুমে লুকিয়ে ছিল।

গুলি করতে করতে পাকিস্তানি সেনারা দোতলায় বঙ্গবন্ধুর বেডরুমে গিয়ে দরজা ভাঙ্গার জন্য আঘাত করতে লাগল। কেউ কেউ নিচ থেকেই বেডরুমের জানালা লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে লাগল। বঙ্গবন্ধু তখন মাঝের রুমে পায়চারি করছিলেন। চারদিকে গুলির শব্দ। দোতলায় দরজা থেকে বঙ্গবন্ধু বললেন, এরপর সেনারা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে চলে গেল। এর কিছুক্ষণ পর বঙ্গমাতা (বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব) মোমবাতি জ্বেলে নিচে আসলেন। তাকে দেখে আমি দাঁড়ালাম। তিনি আমাকে বললেন,‘আপনার ভাইকে নিয়ে গেছে।’ আমি বললাম,‘আমি সব দেখেছি।’ বঙ্গমাতা, শেখ রাসেল, গৃহকর্মী আবদুল ও আমি একই সঙ্গে দোতলায় হারিকেন জ্বালিয়ে বসে রাত পার করলাম।

তার পরের দিন কী করলেন?

মোহাম্মদ মহিউদ্দিন : ২৬ মার্চ সকালে শেখ কামাল আসলেন। রাতের সব ঘটনা শুনলেন। এই অবস্থায় বঙ্গমাতাকে বাসায় রাখা নিরাপদ হবে না। তাকে নিরাপদ স্থানে রাখতে হবে। বঙ্গবন্ধুর বাসার পাশের বাসায় থাকতেন ডা. সামাদ সাহেব। ওই বিপদের সময় তার ছেলে বঙ্গমাতাকে তাদের বাড়িতে নেয়ার জন্য আসলেন। ডা. সামাদের বাড়ির নাম ছিল ‘সড়ায়েখাম’। এটি উর্দুতে লেখা থাকায় পাকিস্তানিরা এই বাড়িতে কখনো হামলা করেনি। ওই বাসায় যেতে হলে দেয়াল টপকে যেতে হবে। আমি একটি টুল দিয়ে বঙ্গমাতাকে দেয়াল টপকাতে বললাম। দেয়ালের ওপর আমি উপুড় হয়ে বসলাম, এরপর বঙ্গমাতাকে বললাম, ‘আমার পিঠে পা দিয়ে ধীরে ধীরে নামেন।’ তিনি আমার পিঠে সম্পূর্ণ ভার না দিয়ে নামতে গিয়ে নিচে পড়ে গেলেন। পড়ে গিয়ে তিনি ‘মাগো’ বলে আওয়াজ করে উঠলেন। সেই আওয়াজ এখনও আমার কানে বাজে।

২৬ মার্চ সারাদিন আমি ও শেখ কামাল ডা. সামাদ সাহেবের বাসায় ছিলাম। রাতে থাকার জন্য সেখান থেকে ৩২ নম্বরের বাসায় চলে আসি। বাড়ির সমস্ত ফটক লাগিয়ে আমি ও শেখ কামাল দোতলায় ঘুমিয়ে যাই। গভীর রাতে গুলির আওয়াজে আমাদের ঘুম ভেঙে যায়। দোতলা থেকে আমরা বুঝতে পারলাম, পাকিস্তানি কমান্ডোর নিচতলার কলাপসিবল গেট ভাঙছে দোতলায় ওঠার জন্য। আমরা তৎক্ষণাৎ দেয়াল টপকে নিরাপদ স্থান খুঁজতে থাকি। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির পেছনের দিকে কিছুটা দূরে বেতারের কর্মকর্তা বাহাউদ্দিন সাহেবের বাড়ি ছিল। ওই বাসায়ই আশ্রয় নিতে হয় আমাদের। পরদিন সকালে আমি ও শেখ কামাল বঙ্গমাতার সঙ্গে দেখা করার জন্য ডা. সামাদ সাহেবের বাসায় যাই। বঙ্গমাতা আমাদের দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার ধারণা ছিল পাকিস্তানিরা শেখ কামাল ও আমাকে হত্যা করে লাশ নিয়ে চলে গেছে। এমন সময় পাকিস্তানি বাহিনী ডা. সামাদ সাহেবের বাসার গেটের সামনে আসে। বঙ্গমাতা আমাদের বললেন, ‘তোমরা আর এখানে এসো না।’ আমরা তখন সেখান থেকে আবার পালিয়ে যাই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here