এক হাঁড়ি শিরনি ৯০ জন পীর

c518a65eceb6e5b97153fc1f635c4bc9-Anis-Alamgir

আনিস আলমগীর ,  ১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ (মুন্সিগঞ্জ নিউজ ডটকম) : বাংলাদেশে এখন আন্দোলনের কোনও ইস্যু নেই। সব রাজনীতির পীর সাহেবেরা ইস্যুর তালাশে ব্যস্ত। গত ৭০ বছরব্যাপী বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন দেখেছে। এই ৭০ বছরের মধ্যে যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় গিয়েছেন তারা গণতন্ত্র চর্চা করতে দেননি এ অভিযোগ ৭০ বছরব্যাপী যারা বিরোধীদলে ছিলেন তারা উত্থাপন করেছেন। কোনটা গণতন্ত্র আর কোনটা অগণতন্ত্র—বাংলাদেশের মানুষের কাছে সে ধারণা এখনও অস্পষ্ট। সুতরাং গণতন্ত্রের নামে আন্দোলনে কেউ এখন আর সুবিধা করতে পারছেন না। গণতন্ত্রের নামে আন্দোলনে এখন আর মানুষ অংশগ্রহণ করে না। মানুষ এখন নিজের প্রাণের মূল্য বুঝতে শিখেছে।

‘তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি’ দীর্ঘদিনব্যাপী রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে এবং আন্দোলন করছে। এ আন্দোলনের লোকেরা সিংহভাগ বামপন্থী। দীর্ঘদিন পরিশ্রম করে তারা এ ইস্যুটির প্রতি সম্ভবত জাতির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছেন। আমি যদি ভুল না করে থাকি বর্তমান সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর আগে থেকেই তারা এই আন্দোলনে আছে। কিন্তু রাজনীতির মতলববাজেরা এসে বামপন্থীদের এ আন্দোলনে শরীক হওয়ার আওয়াজ তুলেছে এখন।

বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াও বলেছেন জাতীয় স্বার্থে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র তারা হতে দেবেন না। বেগম জিয়া ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি এই দশ বছরের মধ্যে টঙ্গিতে ৯০ মেগাওয়াটের একটিমাত্র বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন। তাতেও তার গুণধর পুত্র তারেক রহমান আর তারেকের বন্ধু মামুনের বিরুদ্ধে ২০ কোটি টাকা ঘুষ নেওয়া আর মানি লন্ডারিং-এর অভিযোগে মামলা হয়েছে এবং তাদের ৭ বছর করে কারাদণ্ড ও ২০ কোটি টাকা করে জরিমানা হয়েছে। এ মামলায় হাইকোর্টের রায়ের কালি এখনও শুকায়নি।খালেদা জিয়া যখন প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বিদায় নেন তখন ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো। এখন ১৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। বিদ্যুৎ আর গ্যাসের জন্য স্থানীয় বলুন বা বিদেশি বলুন—কোনও বিনিয়োগই উৎসাহিত হচ্ছে না। গ্যাস আর বিদ্যুতের জন্য জাতীয় উন্নয়ন স্থবির হয়ে রয়েছে। এ জন্যই শেখ হাসিনার সরকার নতুন নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করছে। ত্রিপুরার দরাটানা প্রজেক্ট থেকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ক্রয় করেছে আরও একশত মেগাওয়াট কেনার কথা চলছে। রামপাল আর মহেশখালী বিদ্যুৎ প্রকল্প শেষ হলে আরও ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সংযোজিত হবে। এখন গ্যাস টারমিনাল স্থাপন করে বিদেশ থেকে গ্যাস আনার কাজও এগিয়ে চলছে।

কয়েক বছর আগে মুন্সীগঞ্জের নবাবগঞ্জে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর গড়ার জন্য জমি অধিগ্রহণের যে প্রক্রিয়া চলছিল তাও কিছু মানুষের অনাগ্রহের কারণে স্থগিত হয়ে যায়। তাতেও খালেদা জিয়া আন্দোলনের হুমকি দিয়েছিলেন। অথচ যেখানে বিমানবন্দর স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল তাতে অর্ধেক জমি ছিল পরিত্যক্ত সম্পত্তি, যার মালিকানা সরকারের। বরং জমিগুলো অবৈধভাবে ভোগ করছে স্থানীয় টাউটরা। টাউটরাই আন্দোলনটা করেছিল। অথচ রফতানির মালামাল এয়ারলিফট-এর জন্য একটা বড় বিমানবন্দরের প্রয়োজন ছিল। বর্তমান বিমানবন্দর দিয়ে যে প্রয়োজন মেটানো যাচ্ছে না। বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, গ্যাস, বিদ্যুতের সুবিধা পর্যাপ্ত পরিমাণে না থাকলে শিল্প বাণিজ্যের প্রসার কিছুতেই সম্ভব হবে না। আন্দোলন করে করে সব উন্নয়ন প্রকল্প যদি বন্ধ করে দেওয়া হয় তবে জাতির উন্নয়ন সম্ভব হবে কী করে!

তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নেতারা এখন রামপালকে নিয়ে একটা আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। ভারতবিদ্বেষী, সরকারবিরোধী—সবাই এখন উদগ্রীব হয়ে গেছে এ আন্দোলনে শরীক হতে। এজন্যই বলেছিলাম ‘এক হাঁড়ি শিরনি নব্বইজন পীর।’

সুন্দরবন সমুদ্র উপকূলবর্তী ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। কেউ কেউ বলেন সুন্দরী গাছের নামে এই বনের নাম হয়েছে সুন্দরবন। বাংলাদেশের অংশে সুন্দরী গাছ বেশি, পশ্চিম বাংলার অংশে গরান গাছ বেশি। এখন যেখানে সুন্দরবন সেখানে এক সময়ে জনবসতি ছিল। শান বাঁধানো পুকুর ঘাট এবং বাড়ির ধ্বংসাবশেষ মাটি খুঁড়ে পাওয়ার পর এ বিষয়টা নিশ্চিত হওয়া গেছে। সমুদ্র উপকূলের জনবসতিতে মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের অত্যাচারে জনবসতি সেখানে থেকে উঠে গিয়ে দেশের অভ্যন্তরে চলে আসে। পতিত ভূমিতে বনাঞ্চল সৃষ্টি হয়। পশ্চিম বাংলার অংশে কষ্ঠি পাথরের মূর্তিও পাওয়া গেছে।

ছিয়াত্তরের মনন্তরের পর ব্রিটিশেরা আগুন দিয়ে সুন্দরবনের জঙ্গল পরিষ্কার করে চাষাবাদের ব্যবস্থাও করেছিল। সুন্দরবনের জমি খুবই উর্বর। কৃষি বিভাগ বাঁধ দিয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করে জমি পতিত রাখতো, বৃষ্টির পানিতে জমি ধুয়ে গেলে লবণাক্ততা দূর হয়ে যেত। তারপর জমিতে চাষ করতো। দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ করতে সে সময়ের কৃষি বিভাগ এ ব্যবস্থা নিয়েছিল। সুন্দরবনের বয়স বেশি হয়নি। মূল ভূখণ্ডে ফসলের আবাদ বেড়ে গেলে সুন্দরবনে আবাদের ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। তখন থেকে বনাঞ্চল গড়ে ওঠে—সাপ, হরিণ, কুমির, বাঘের অভায়রণ্যে পরিণত হয়।

তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি বলছে রামপালে কয়লাভিত্তিক ১৩২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে উঠলে সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে যাবে। জীববৈচিত্র্য বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কয়লা পরিবহনের জাহাজের চলাচলের কারণে প্রাণীকুল নাকি ভীত হয়ে যাবে। এই রক্ষা কমিটির কথা শুনলে মনে হয় এটা যেন ভারতীয় গোরক্ষা সমিতির মতো। গরুর জন্য নরবলি। তাদের অভিযোগ প্রমাণিত নয়। প্রমাণিত হলেও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য মানুষের উন্নয়নের মুখ্য জিনিস বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ করে দিতে হবে—এটা বেমানান দাবি! ১৬ কোটি মানুষের কথা চিন্তা না করে বিষাক্ত সাপ, হিংস্র বাঘ, মানুষখেকো কুমির—এর জীবনরক্ষার আন্দোলন কতটা সমর্থনযোগ্য! অন্তত বর্তমান বাস্তবতায় আমি সমর্থন করতে পারছি না।

দিনাজপুরের বড় পুকুরিয়া ২৫০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে বহুদিন আগে। এ কেন্দ্রের পশ্চিম পাশে বিরাট সবুজ বন। এ বনটি ২০০১ সালে যেরূপ ছিল এখনও সেরূপ বিরাজ করছে অথচ বনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে মাত্র কোয়ার্টার কিলোমিটার পশ্চিমে। বড় পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাংলাদেশে স্থাপিত প্রথম কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এটার প্রযুক্তিও খুব উন্নত নয়। আর রামপালের বিদ্যুৎকেন্দ্রটি অত্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তিতে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। বিদেশে নয়, আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠিত বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি আমরা তা থেকেও বলা যাচ্ছে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবনের ব্যাপক কোনও ক্ষতি করবে না এবং জীববৈচিত্র্যও বিলুপ্ত হওয়ার কোনও সম্ভবনা নেই। তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটিকে আমরা আহ্বান জানাই যেন তারা রামপালের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেন। সরকারকে অনুরোধ করবো, রামপাল প্রকল্প অব্যাহত রেখেই পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে যতটা সম্ভব কমিটির উদ্বেগগুলোকে আমলে নিতে।

বাংলা ট্রিবিউন

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক

anisalamgir@gmail.com

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here