বিক্রমপুরে সেকান্দরের চক

map-of-munshiganj-মুন্সিগঞ্জের-মানচিত্র

গোলাম আশরাফ খান উজ্জ্বল: ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬ (মুন্সিগঞ্জ নিউজ ডটকম) : কেওয়ার বার আউলিয়ার মাজারের ঠিক দক্ষিণ পাশে, কেওয়ার মিয়াবাড়ি, খান বাড়ি উত্তর মহাকালী সরদার বাড়ির পশ্চিম পাশ। উত্তর মহাকালী আলিম উদ্দিন ফকিরের বাড়ি বেপারী বাড়ি উত্তর পাশ এবং কাজী বাড়ি ও মোল্লাবাড়ি পূর্ব পাশে যে ফসলি মাঠ।

সে মাঠকে কেওয়ার-মহাকালীর লোকেরা সেকান্দর চক বলে থাকে। এ সেকান্দরের চকের বুকের উপর দিয়েই এল.জি.ইডি’র পিচ ঢালা সড়ক লোহারপুল থেকে ভাঙ্গা হয়ে টঙ্গীবাড়ি পর্যন্ত চলে গেছে। এ সেকান্দরের চকে ধান, তিল, কাউন, মসকলাই, আখ চাষ হতো এক সময়। এখন এ চকে প্রচুর আলু ও পাট জন্মে। কখনো কৃষক ধঞ্চে বুনে থাকে রান্নার কাজের জন্য। এ চকটি খুব বড় ধরনের নয়।

প্রাচীন কালে হয়তো আরো বড় বা প্রসারিত ছিল। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে সেকান্দরের চকে বাড়ি নির্মাণ হচ্ছে। ফলে সংকুচিত হয়ে পড়েছে এ চকটি। কী কারণে এ চকটির নাম সেকান্দরের চক তা সঠিক ভাবে বলা যায় না। তবে অনুমান করা হয় গৌড় পান্ডুয়ার শাসক সিকান্দর শাহের নামানুসারে মুন্সীগঞ্জের এ এলাকাটির নাম সিকান্দারের চক হতে পারে। মুদ্রা, শিলালিপি ও যুদ্ধ ক্ষেত্রের বিচারে এ সেকান্দরের চক সিকান্দরের চক হওয়ার কথা। স্থানীয় ভাবে সিকান্দারকে সেকান্দার বলা হয়। সে যাই হোক।

সুলতান সিকান্দার শাহ্ ৭৫৮ হিজরিতে বাংলার সিংহাসন আরোহন করেন। তিনি গৌড় পান্ডুয়া, বিক্রমপুর, সোনারগাঁও, ফিরোজাবাদ সহ বাংলার বিশাল এলাকা শাসন করতেন। সিংহাসনে আরোহন করেই সিকান্দার শাহকে দিল্লীর সুলতান ফিরোজশাহকে মোকাবেলা করতে হয়। ৭৬০ হিজরির যুদ্ধে সিকান্দার শাহ জয়ী হন। যুদ্ধ ক্ষেত্রের নাম জানা যায়নি। মুদ্রার বিচারে সিকান্দার শাহ ৩৭ বছর রাজত্ব করেন।

সিকান্দার শাহের সুযোগ্যপুত্র সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ্ ৭৮৪ হিজরির পর ৭৮৫ হিজরির কাছাকাছি সময় গৌড় পান্ডুয়া থেকে বিদ্রোহ করে সোনারগাঁয়ে চলে আসেন। এ বিদ্রোহের কাল কোন কোন ঐতিহাসিক ৭৭৮ হিজরি বলে মনে করেন। সোনারগাঁয়ে অবস্থান করে গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ্ নিজেকে পূর্ব বাংলার স্বাধীন সুলতান হিসেবে ঘোষণা দেন। ফলে পিতা সিকান্দর শাহের সাথে পুত্র গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের যুদ্ধ বাধে। এ যুদ্ধটি হয়েছিল ৭৯৫ হিজরির শেষ ভাগে। অর্থাৎ অক্টোবর ১৩৯৩ খ্রিষ্টাব্দে।

খুব সম্ভবত সিকান্দার শাহ তার বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে বিক্রমপুরের পূর্বপ্রান্তে সোনারগাঁয়ের নিকট অবস্থান করেছিলেন। মুন্সীগঞ্জ বিক্রমপুরের যে স্থানে সিকান্দার শাহ্ সৈন্য সমাবেশ করিয়েছিলেন সে স্থানটির নাম সিকান্দারের চক। কথ্য ভাষায় সেকান্দারের চক হিসেবে পরিচিতি পায়। এমনও হতে পারে এই চকে বা খোলা ময়দানে পিতা সিকান্দার শাহের সাথে পুত্র গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের যুদ্ধও হতে পারে। সিকান্দার যুদ্ধ ক্ষেত্রে মারা গেলে তার নামানুসারে এই ময়দানের নাম সিকান্দারের চক রাখা হয়। কেননা এ চক হতে সড়ক পথে সোনারগাঁও, সম্ভুপুরা, কলাগাছিয়া সর্বোচ্চ ১০ কিলোমিটারের মধ্যে। নৌপথে ৬ কিলোমিটারের কম হবে। এ সিকান্দারের চকের আশেপাশে বেশ কয়েকটি প্রাচীন মাজার পরিলক্ষিত হয়।

যেমন কেওয়ার চৌধুরী বাড়ী সংলগ্ন প্রাচীন পাঁচটি মাজার। যা সুলতানী যুগের ইটের গাঁথুনি। কেওয়ার খান বাড়িও মিয়া বাড়ি সংলগ্ন দুটি মাজার, উত্তর মহাকালী আজগর ঢালীর বাড়ির একটি মাজার এবং উত্তর কেওয়ার প্রাইমারী স্কুল সংলগ্ন একটি মাজার। এ মাজারগুলোর কোন নাম নেই। কেউ বলে গায়েবী মাজার।

আমার মনে হয়েছে ১৩৯৩ খ্রি: সিকান্দার শাহ ও গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের যুদ্ধে নিহত মুসলমান সৈনিকদের সমাধী বা মাজার। সিকান্দারের চক সিকান্দার শাহের স্মৃর্তি বহন করে চলছে মহাকালের দিকে। এ গবেষণাটি অনুমান নির্ভর। তবে সত্যকে এড়িয়ে নয়। আগামী ভবিষ্যত প্রজন্ম সেকান্দরের চকের সত্য ইতিহাস বের করে আনবে এ আশাই রইল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here