তিন তরুণ কবির কবিতা

 

1photo_ayan-sayed-horz

৯ সেপ্টেম্বর  ২০১৬ (মুন্সিগঞ্জ নিউজ ডেস্ক) :

অয়ন সাঈদ

১.

মৃত শহরে কিছুক্ষন প্রেত হয়ে বসে থাকি

1photo_ayan-sayedদপ্তর থেকে দপ্তরে আমাদের অধিকারটুকু
লোমশ পান্ডাদের বিরক্তির কারন হয়ে ওঠে!
টাইপ রাইটার গুলোতে এখন আর ব্যাস্ততা নেই কোন;
টেবিলে টেবিলে ইন্টারনেট ক্যাবলের কলা
অথচ তাহাদের পোদে ঢুকে-
আলস্যে বিলি কাটে ই-মেইলের আঙ্গুল।

আমরা বোধহয় ডাক পিয়ন হয়েই জন্মেছি
তাদের প্রিয়ভোজের গোপন ম্যানুতে-
পৌঁছে দিতে হয় সেকেলে খামগুলো!
সরকারি প্রিন্টিং মেশিনেরা
আমাদের কষ্টার্জিত রক্ত ছাড়া অকেজো পড়ে থাকে।

তবুও ভালোবাসি, ভালোবাসি এই-
মৃত শহরে কিছুক্ষন প্রেত হয়ে বসে থাকা,
রিক্সায় যে নারী আড়চোখে দেখে চলে গেছে
কাটাখালী ব্রিজে শুকোতে দেয়া বর্ষার পাটের ঘ্রাণের মতো
তার গ্রামীণ চুলের আনন্দে
মনে হয় পান করে চলেছি শরবতের মতো চোখ জোড়া তার,
তলানিতে পড়ে থাকে লেবুর দানার মতো
তাহার চোখের গোলাপি মণি।।

২.

নিদ্রাসংগম কেটে গেলে

অনিশ্চয়তার ধারাপাত গুনে গুনে দূরত্ব এতোটাই
আমাদের মাঝ দিয়ে চলে গেছে-
নিরেট কাফনের ঘ্রাণের মতো সাদা আকাশ,
তবু অভ্যন্তরীণ দাবদাহে লেগেছে
জুলাইয়ের গন্ধরাজ-  কামিনীর মদ;
তোমার বেণি ভেবে বারবার ছুটেগেছি
ভাদ্রা ফুলের কাছে, ভ্রমে রক্তই ঝরিয়েছি,
ব্রিজের রেলিংয়ে, রিকশার হুডে তোমার রেখে যাওয়া স্পর্শ
ছুঁয়ে দেখতে দেখতেই চলে গেলো বর্ষাকাল!

পলি পারদ- ডালপালায় ডুবে গেছে পা
বিরুদ্ধ স্রোতে চিত হয়ে শুয়ে থাকে মন,
নিদ্রাসংগম কেটে গেলে
সকালে দেখি কৈশরের বয়োঃসন্ধিকাল
সাঁতরে গেছে কতটি কদম মাস!
অথচ এই যৌবনের যৌনতা,
এই নগ্ন সমর্পন অগ্রাহ্য করে কথাছিল
গিয়ে দাড়াই অন্যায় ও প্রহসনের মুখোমুখি।

গচ্ছিত রাখলাম

তোমায় দেব বলে রেখেছিলাম
মুঠো মুঠো অভিশাপ,আজ বৃষ্টি হবে শুনে-
ধূলো ঝড়ে কেঁপে ওঠে উঠোনের ঝরাপাতা,
মেঘলা দিনের ফেনিল ঢেউ ধলেশ্বরীতে তবু
সব মেঘ তার ঝরেনি আমের বোলের মতো;

আমার পাতাল ঘুমে করাঘাত শুনি
এখনো মোমের শয্যায় বরফ গলে,
ব্যার্থ থ্রি-পিছ দড়িতে শুকোচ্ছে হাসুর!
নাতিশীতোষ্ণ বাকলের আম-কড়ুইয়ের ছাল
খসে খসে পড়ে মুমূর্ষ নক্ষত্রের মতো;

আজ যাবতীয় যন্ত্রণা-ক্লেদ-কলহ
চিতার আগুন-  ফাঁট ধরা সিঁড়ি ঘাটে
রোয়াকের টেবিলে, তোমার সংসারে
গচ্ছিত রাখলাম, গচ্ছিত রাখলাম।

৪.
রাতভর প্রজ্ঞার পাঠ চলে গুহায়

সময়ের চুলস্রোত-  হাড়ের গভীরে
রেখে যায় কতগুলো গাঢ় দাগ!
বিস্তার জোনাকীর মতো কিছু জ্বলে
কিছু নিমজ্জিত থাকে পদার্থ বিদ্যায়;
তোমার আত্মার প্রতিটি দিক বদল-
আমার চোখে তার মুহূর্ত ধরা দেয়।

বাতাসে টানেলের মতো করে
পথ ঘুরতে থাকে অভ্যস্ত আধারে
আকাশে মেঘের গমনে দৃশ্যায়িত হতে দেখি
মিশর সভ্যতার ফারাও সম্রাজ্যের স্পিংক্স,
কোন এক উলঙ্গ শিশু শুয়ে আছে খেজুর গাছের ছায়ায়
গ্রহণের উর্বর স্রোতে আরও অতল মজ্জায়
রাতভর প্রজ্ঞার পাঠ চলে গুহায়।
সজল

১.

কাব্যকথা

2photo_sajalকবিতার বইগুলোকে মনে হয়, পৃথিবীর
সবচেয়ে আদিম বৃক্ষ; কিংবা
নিঃসঙ্গ কাঙাল প্রেমিক..
কতকোটি বছর ধরে যে সে পড়ে আছে,
ঝরে পড়া নক্ষত্র, দ্রিদিম জ্যোৎস্না!
.
মানুষ কবিতা পড়ে না। গুগলে সার্চ
দিয়ে ঠিক চটি বের করে মেটায় কাম
তৃষ্ণা। ভীষণ ফাঁকা চতুর বনিক সে; যুগ
তাঁকে স্মার্ট ওয়েতে শিখেয়েছে-
কী করে বের করে নিতে হয়, ন্যানো
সেকেন্ড পাইকারি রমণীদের পসরা!
লম্পট স্মার্টফোনের আদলে নীল নীল
খেলা।
.
কবিতা কী? ওসব তো বড্ড সেকেলে।
যত্তসব: মিছেমিছি বাহানা।
অনাহারীর সাজানো প্রলাপ। আর
কবি? হি: হি: তাঁরা পাগল। তা’না
হলে কি শুধুই অশ্রুজলে ডুবেডুবে- প্রেম
পিরিতের গজল লেখা।
.
আসলে, কবিতা কিছুই নয়। আবার
কবিতাই সব সব। ধ্রুপদী বিপদে, আত্নার
খোরাকে; আর সবচেয়ে বড় কথা-
একটি দেশকে তুলে ধরতে পারে বলে,
আমি কবিতার চেয়ে ভাল কিছু
দেখিনা।

২.

একবার দেখো

আমাকে একটি চিমটি কেটেই
দেখো, আমি কতোটা আন্দদে
উল্লাসে আত্নহারা হয়ে যাই।
কতো ছোট্ট কিছুর জন্য আমি নাচঁতে
নাচঁতে পাহাড়ে উঠি, একটু মেঘের
ছোয়ায় ভিজতে ভিজতে
আমি যে কতটা পাগল থাকি তার
কিছুই তোমরা জানোনা।
.
বিন্দু বিন্দু শিশির জমিয়ে বরফি
করার মধ্যে কি যে আনন্দ আছে
তোমরা কী কখনো দেখেছো?
বৃষ্টির টুপটাপ শব্দে পৃথিবীর কী এক
মায়াবী সুর আছে, তোমরা কেনো
এতো কাছে থেকেও তা দেখোনা?
কোটি কোটি দূর থেকে বিনে
পয়সায় তোমরা দেখো, চাঁদ, তারা,
আকাশ-বিজলী;
অথচ এসবের কিছুর-ই মূল্য তোমাদের
কাছে নেই।
.
একবার চোখ দুটো দিয়ে ভালো করে
তাকিয়ে দেখো তো-
আমি তো তোমাদেরই একজন।
আমার নাম আনন্দ ঢেউ আমার নামই
প্রকৃতি।

 

গোলাম আযম গালিব

১.

উৎসর্গ

3photo-galibসমান্তর ধারার কিছু কবিতা…
কোন একটি লাল গোলাপ,
কোন এক কিশোরের হাতে হাত হয়ে,
অন্তরের উষ্ণ রক্তের প্রতিকৃতি বয়ে,
স্ব-প্রেমের বাসনায়-
গিয়ে পৌঁছে, কোন এক কিশোরীর হাতে।
হায়! তা আর হাতে নয়!
তা শূন্যে জায়গা করে নিল।
তাতেও যেন ঠাঁই নাই।
অবশেষে শক্ত রাজপথের বুকে…

-তারপর? তারপর?

কিশোরীর আলতা-রাঙ্গা পায়ের কঠিন জুতো…
যেন রাজপথ আর লাল গোলাপ-
একে অন্যের সাথে একাকার হল।

-হাঃ! হাঃ!! হাঃ!!!
তুমি হাসছো???

সেদিন কিশোরী ভাঙ্গেনি-
কিশোরের মনকে, করেনি নষ্ট ফুলকে।

-তবে?

ভেঙ্গেছে নিজেকে, গুড়িয়েছে মনকে;
হারিয়েছে জনাকে, ভুলেছে স্বপনকে।
তারই মাঝে?…
খুঁজে পেল নিজেকে।

কিশোরী,
যাচ্ছিল সেই গলিপথ বেয়ে।
পরিচিত রাজপথ।

মনে নতুন স্বপ্ন, নতুন কথা, নতুন গল্প,
নতুন আবেগ, নতুন আকর্ষণ।
যেন এক নয়, দুই নয়;
হাজারো নতুনের সমারোহ।

পাখির কলরবকে মনে হল-
নতুনের আহ্বান।
পদক্ষেপ যেন ছন্দ হারাচ্ছিল।
গাড়িরর হর্নগুলোকে মিউজিক মনে হচ্ছিল।

অবশেষে সেই রাজপথ।
সূয্যি মামা কি লাল হয়েছিল লজ্জায়?
নাকি ক্রোশের বহিঃ প্রকাশ?
গাছগুলো কি মহামিলন দেখতেই থমকে গেল?
নাকি সেদিনের কথা ভেবে?…
কিশোরী স্তব্ধ, নিরুত্তর।
সে কেন? হাসলো না কেন?
কী বলবে তাই ভেবে?
নাকি অন্যকিছু…

এটা কি গভীর আকর্ষণবোধ?
নাকি প্রবল প্রমের জোয়ার?

হ্যাঁ। হতে পারে মিলন মধুরক্ষণ।
অনেক প্রতীক্ষায় পাওয়া।
তাই হয়ত…

-তবে কিশোরের অনুভূতি?…
কে যেন (অচেনা) পড়ে আছে রাজপথে।
মুখটা বিকৃত।
চুলগুলো অগোছালো।
ডানহাতটা আঁকড়ে ধরবে যেন।
তবে কাকে?

পা দু’টো যেন দুরন্ত ছুটে যাওয়ায় ব্যস্ত।
তবে ছুটছে না কেন?
বুকটা দেখে মনে হল-
অদম্য সাহস তার।
ভবিষ্যৎ পৃথিবীর পদযাত্রায়
যেন তা জ্বালানী হবে।

এত কিছুর পরও…
সে কেন প্রতিবাদ করছে না?
রোগ-দালাল মাছিগুলো যখন ভ্যান্ ভ্যান্ করছে।
কতক কুকুর জড়ো হল।
ধীরে ধীরে মানুষের ঢল।
সবাই ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে।

ওষ্ঠদ্বয়ের ভঙ্গিতে কি বলতে চাচ্ছিল কিশোর?
তবে থেমে গিয়েছে।

পাবলিক,
চিরুণী অভিযান চালাল।
অভিযান চলল ঐ দেহের উপর।

একটু এগুতেই…
সিডেক্সিনের খোসাগুলো,
অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে।

বাম হাতের মুঠো খুলতেই
বেরিয়ে এল-
শুকনো গোলাপের অগোছালো ছিন্ন-ভিন্ন কতক পাপড়ী,
গায়ে তাদের শত আঘাতের চিহ্ন।
মনে হচ্ছে- এক্ষুনি তারা কাঁদতে শুরু করবে।

জামার পকেটে তার
ছিল ক্ষুদ্র চীরকুট।
সে চীরকুট তার ভাষায় কথা বলল।
বলতে লাগল, ঘোষণা করল-
“চামড়ার দেহ উৎসর্গে
পেলাম তোমার মন।”

 

হাবিযাবি কবিতা নং- ০০৯১
.
ফোঁকার অভাবে সিগারেট নিভে যায়,
বাতাসের অভাবে আগুন,
আগুনের অভাবে উষ্ণতা,
উষ্ণতার অভাবে হৃদয়।
.
হৃদয়ের অভাবে যত্ন থেমে যায়,
যত্নের অভাবে সম্পর্ক,
সম্পর্কের অভাবে সময়,
সময়ের অভাবে জীবন।
.
জীবনের অভাবে মানুষ মরে,
মানুষের অভাবে পরিবার,
পরিবারের অভাবে সমাজ,
সমাজের অভাবে সভ্যতা।
.
সভ্যতার অভাবে সংস্কৃতি লুপ্ত হয়,
সংস্কৃতির অভাবে শ্রদ্ধা,
শ্রদ্ধার অভাবে শান্তি,
শান্তির অভাবে সুখ।
.
সুখের অভাবে বাবা মরে,
বাবার অভাবে মা,
মায়ের অভাবে দুধ,
দুধের অভাবে শিশু।
.
শিশুর অভাবে সুযোগ থেমে যায়,
সুযোগের অভাবে প্রতিভা,
প্রতিভার অভাবে কবি,
কবির অভাবে কবিতা,
কবিতার অভাবে নারী,
নারীর অভাবে প্রেম।
.
প্রেমের অভাবে প্রেমিকা উধাও,
প্রেমিকার অভাবে প্রেমিক,
প্রেমিকের অভাবে হৃদয়,
হৃদয়ের অভাবে ভালোবাসা।
.
– এই তো শিখেছি পৃথিবীর পড়তে পড়তে।
– তুমি আমি?
– সে তো প্রতিপাদিক।
– আচ্ছা, প্রতিপাদিক যেন কি?
– আমি ব্যকরণ ভুলে গেছি যে।
– তবে এখানেই থাক।
– থাকল।
– কেমন আছ তুমি?
.
আমার চাপা দীর্ঘশ্বাস।
তোমার শব্দহীন কান্না।
আমার জলন্ত সিগারেট,
তোমার স্বংসারী রান্না।
আমার ক্যান্সার।
তোমার বিয়ে।
আমার মৃত্যু।
তোমার সন্তান।
.
শেষ! আর পারি না। প‍রের শব্দগুলি তুমি বসিয়ে নিও। বলি-
সন্তানের মুখে স্তন ঠেলে স্পর্শহীন অযাচিত পুরুষের কথা ভাবছ কেন?

 

 

 

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here