মুন্সিগঞ্জের স্মৃতিচারণ নিয়ে পূরবী বসু এই লেখা

purobi_bosu_1২৩ সেপ্টেম্বর  ২০১৬ (মুন্সিগঞ্জ নিউজ ডেস্ক) : [কথাসাহিত্যিক ও বিজ্ঞানী পূরবী বসু ১৯৪৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। প্রথিতযশা লেখক পূরবী বসু বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। স্মৃতিবিজড়িত মুন্সীগঞ্জ শহরে বিচরণের এক ফাঁকে তার সাহিত্য জগতে পা রাখা। পূরবী বসুর আরেক পরিচয় তিনি খ্যাতিমান লেখক জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের স্ত্রী।]

মুন্সিগঞ্জের স্মৃতিচারণ নিয়ে পূরবী বসু এই লেখা

অর্ধশতাব্দী আগে…

বহুকাল আগে এক স্কুলবালকের কাছে গ্রাম ও শহরের প্রধান পার্থক্য কী জানতে চাওয়া হলে সে বলেছিল, শহরের বাড়িঘরগুলি খুব কাছাকাছি আর গ্রামে এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ির দূরত্ব অনেকটাই। তখনকার দিনে এটি একটি বড় পার্থক্য ছিল সন্দেহ নেই, যা আজও সত্য গ্রামে-শহরে। তবে আমরা যারা অন্তত অর্ধশতাব্দী আগে এ দেশে জন্মেছি তারা সবাই জানি, আজ থেকে ৪০-৫০ বছর আগে বাড়ি থেকে বাড়ির দূরত্ব ছাড়াও দৃশ্যত প্রকট আরও অনেক ব্যবধান ছিল গ্রাম ও শহরের মধ্যে। বিশেষ করে প্রাত্যহিক জীবনে প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধা বা উপকরণে, রাস্তাঘাট, যানবাহন, পোশাক-আশাকে। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিতে বিশেষ করে দূরপাল্লার সড়ক, ফেরি ও মোবাইল ফোনের কল্যাণে, বিদ্যুতের মহিমায় গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির প্রসারে, আর বহির্বিশ্বে গ্রামীণ তরুণ সম্প্রদায়ের কিছু সদস্যের নিয়মিত যাতায়াতে ও কর্মসংস্থান হওয়ার সুযোগে গ্রাম-শহরের পার্থক্য আজ আর তেমন তীব্র হয়ে চোখে পড়ে না।

আমার গল্প পড়ে কাউকে কাউকে মন্তব্য করতে শুনেছি অনায়াসেই নাকি বোঝা যায় আমি গ্রামের মেয়ে। গ্রামেই বেড়ে উঠেছি। মুন্সিগঞ্জ শহর, যেখানে বেড়ে ওঠা, তা এমনকি সেই পঞ্চাশ বা ষাটের দশকেও ঠিক গ্রাম ছিল না। তবে অন্তত একটি গ্রামের সঙ্গে আমার পরিচয় রয়েছে। সে কথা পরে বলি। মুন্সিগঞ্জ মফস্বল শহর। চারদিকে নদী দিয়ে বিচ্ছিন্ন, একাকী দ্বীপের মতো, ছিমছাম ছোট্ট এক শহর। এক রাস্তার এই শহরের প্রধান পাকা রাস্তাটি শুরু হয়েছিল নদীর ধারে গুদারাঘাট থেকে। চলে গিয়েছিল শহরের শেষ মাথা পর্যন্ত। এই রাস্তার উপরেই সব দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত। রাস্তার দু’পাশ দিয়ে ভেতরের দিকে গড়ে উঠেছিল ছোট ছোট আবাসিক এলাকা। এগুলো বিভিন্ন পাড়া নামে পরিচিত যেমন জমিদারপাড়া, মালপাড়া, গোয়ালপাড়া, লক্ষ্মী নারায়ণপাড়া, মাঠপাড়া, শ্রীপল্লী, বাগমাদুদালী খালপার, কোটগাঁও ইত্যাদি। মুন্সিগঞ্জ শহরে তখন কোনো গাড়ি বা বাস চলাচল করত না। ট্রেনের তো প্রশ্নই আসে না। শুধুই ছিল রিকশা ও সাইকেল। মনে পড়ে, শহরের একমাত্র মোটরযান ছিল তখন লাল রংয়ের ফায়ার ব্রিগেডের বহু পুরনো এক ট্রাক। দু-চার বছরে একবার যখন বেরুতো সেই লাল গাড়ি, ঘণ্টা বাজিয়ে বড় রাস্তা দিয়ে যখন চলে যেত- এর সঙ্গে কারও কোনো দুর্ভাগ্যের বা অশুভ ঘটনার যোগাযোগ থাকতে পারে, এ কথা তখন বাচ্চাদের মনে-ই আসত না। আমরা প্রচন্ড আমোদ আর উত্তেজনায় ছুটে যেতাম রাস্তায় শুধু একনজর চলতি এক গাড়ি দেখার জন্য। আমাদের শহরে বহুকাল পর্যন্ত কোনো বিদ্যুৎ ছিল না। স্থানীয় বরফের কল থেকে সন্ধ্যায় মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য ডিসি সাহেব ইলেকট্রিসিটি বিতরণ করার জন্য ব্যবস্থা করেছিলেন, সর্বপ্রথম যেসব মুষ্টিমেয় সৌভাগ্যবানের বাড়িতে ইলেকট্রিসিটি এসেছিল, তাদের মধ্যে আমাদের পরিবার ছিল অন্যতম। দীর্ঘকাল ধরে এ অঞ্চলে আমাদের বসবাস ও ডাক্তার হিসেবে বাবার পরিচিতির সুবাদেই হয়তো এটা জুটেছিল।

মারফি রেডিও, অনুরোধের আসর, বীরেন্দ্রকৃষ্ণের মহালয়া…

মনে পড়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য বাসায় বিদ্যুৎ আসার পর পরই বাবা ঢাকা গিয়ে একদিন বেশ বড়সড় চৌকো সাইজের একটা মারফি রেডিও কিনে এনেছিলেন। সেই রেডিওর সামনে গোল হয়ে বসে আমরা খবর শুনতাম। গান শেখারও চেষ্টা করতাম পঙ্কজ মল্লিকের নির্দেশনায় রেডিওর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। সার্বক্ষণিকভাবে যখন বিদ্যুৎ থাকতে শুরু করল তখন আমাদের সবার প্রিয় ছিল অনুরোধের আসর। ষাটের দশকের শুরুতে সেই সময় হেমন্ত, শ্যামল, মানবেন্দ্র, সতীনাথ, তরুণ, ধনঞ্জয়, মান্না, সন্ধ্যা, লতা, প্রতিমা, আল্পনা, গীতা, উৎপলা, আশা, নির্মলা, ইলা, গায়ত্রীসহ আরও অনেক শিল্পী আমাদের মোহগ্রস্ত করে রাখতেন তাদের অনবদ্য সুরের লালিত্যে। অনুরোধের আসরের দিন ভোর থেকেই জল্পনা-কল্পনা চলত সেদিন কোন কোন প্রিয় গান বাজানো হবে। পরস্পরের সঙ্গে বাজিও ধরতাম এই নিয়ে। আমার ঠাকুমা যিনি প্রযুক্তির ধার ধারতেন না মোটেই, মাঝে মাঝেই তার নিজস্ব অনুরোধ নিয়ে আসতেন আমাদের কাছে। সন্ধ্যার ‘মধুমালতি ডাকে আয়’ গানটা যেন তক্ষুণি বাজানো হয় ওই যন্ত্রে অর্থাৎ রেডিওতে। আমরাও দুষ্টুমি করে ক্ষেপাতাম তাকে এই বলে, অমুক সময়ে অনুরোধের আসরে বাজাব। তখন শুনবে। ঠাকুমারা প্রায়ই কুপি নিয়ে আসতেন, ইলেকট্রিক লাইট বাল্ব থেকে সেটা জ্বালিয়ে নেয়ার জন্য। মনে পড়ে, পূজার ঠিক আগে আগে মহালয়ার দিন ভোর রাতে অনেক প্রতিবেশী ভিড় করত আমাদের বারান্দায় রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ভরাট কণ্ঠে মহালয়ার বিশেষ অনুষ্ঠান শোনার জন্য। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আধো আলোয়-অন্ধকারে মাথায় চাদর চাপা দিয়ে প্রতিবেশীরা এসে জড়ো হতো আমাদের বাইরের বারান্দায়। রেডিওর শব্দ যতটা সম্ভব বাড়িয়ে দেয়া হতো যাতে সবাই ভালমতো শুনতে পায় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের অনবদ্য কণ্ঠস্বর ও উচ্চারণ।

মহালয়া অনুষ্ঠান শোনার পর বয়োজ্যেষ্ঠরা একসঙ্গে প্রাতঃকালীন ভ্রমণে বেরোতেন নদীর ধারে। নদীর ধারে হাঁটতে যাওয়া, হয় সকালে অথবা বিকেলে, একটা নিয়মিত স্বাস্থ্যচর্চার অংশ ছিল তখন প্রায় প্রতি পরিবারেই।

মুন্সীগঞ্জের সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল…

মুন্সিগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গন ছিল বেশ জমজমাট। হরগঙ্গা কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন নাট্যকার আযিমুদ্দিন আহমেদ (আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের পিতা)। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ও তার সহোদর আবদুল্লাহ আল মামুন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক) ওই কলেজে পড়িয়েছিলেন কিছুকাল। আবদুল্লাহ আল মামুন ভাল তবলা বাজাতেন। কলেজে নিয়মিত নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। আযিমুদ্দিন আহমেদ রচিত ‘মহুয়া’ ও ‘মা’ নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল মনে পড়ে। মোতাহার হোসেন বলে আমাদের প্রতিবেশী এক কলেজছাত্র তখন উঠতি নায়ক মঞ্চে। কিন্তু নারী চরিত্রে তখন কলেজের মেয়েরা অভিনয় করত না। নারী চরিত্রে অভিনয় করার জন্য পেশাদার শিল্পীদের নিয়ে আসা হতো ঢাকা থেকে। তারা একদিন আসতেন রিহার্সেলে, অন্যদিন ঠিক নাটকের দিন। ঢাকা থেকে সম্মানী দিয়ে শিল্পী এনে নাটক করা যেহেতু ব্যয়বহুল ব্যাপার ছিল তাই চেষ্টা করা হতো নারী চরিত্রবিবর্জিত বা বিরল নারী চরিত্রে নাটক মঞ্চায়ন করার। কলেজের নাটকে মেয়েরা অংশগ্রহণ না করলেও স্থানীয় পেশাদার শিল্পীগোষ্ঠী যখন জগদ্ধাত্রী বাড়ির বিশাল মঞ্চে নাটক মঞ্চস্থ করত, তখন নারী চরিত্রে সাধারণত নারীদেরই অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে। মালখানগর থেকে বিচিত্রা বসু ও তার ছোট বোন (নামটা মনে নেই) একবার নাটক করতে এসেছিল। (উল্লেখ্য, বিক্রমপুরের সিরাজদিখান থানার মালখানগর ছিল সেই সময়ে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের শীর্ষে) মনে পড়ে বড় সুন্দর ছিল তারা দুজনে দেখতে। রাতে নাটক দেখার পর মেকআপ ছাড়া তাদের আরেকবার স্বচক্ষে দেখব বলে শ্রীপল্লীর খগেন মিত্রের বাসায় পরের দিন সকালবেলায় আমি ও ছোড়দি উপস্থিত হয়েছিলাম মনে পড়ে। বিচিত্রা বসু ও তার সহোদরা সেই বাড়িতেই এসে উঠেছিলেন। খগেন মিত্রের যমজ কন্যা অরুণা ও বরুণার কাছে পরে শুনেছিলাম, তারা ওদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। মেকআপ ছাড়াও এই দুই অভিনেত্রী অত্যন্ত সুদর্শনা ছিল মনে পড়ে। মালখানগরে বিচিত্রা বসু ও তার ভগিনী ছাড়াও স্থানীয় শিল্পী ছায়া রানী দত্তও নিয়মিত অভিনয় করত। একবার অবশ্য গোঁফ কেটে, গলা সরু করে অজিত চৌধুরী অর্থাৎ ছক্কু মোক্তারকেও মেয়ে সেজে অভিনয় করতে দেখেছি। অজিত চৌধুরী ছিলেন তখনকার দিনে ডাকসাইটে উকিল চিন্তাহরণ চৌধুরীর ছোট ভাই। তাদের বাড়ি ছিল থানার পুকুরের উল্টো পাড়ে জগদ্ধাত্রী বাড়ির পেছন দিকটায়। জগদ্ধাত্রী বাড়িতে ছিল বিশাল সেই বকুল ফুলের গাছ। মাটিতে ঝরে পড়া বকুল ফুল তুলে মালা গাঁথার জন্য ভোরবেলা কার আগে কে পৌঁছতে পারে এই নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতো আমাদের মধ্যে। অজিত চৌধুরী ছাড়াও তখন মঞ্চে বিখ্যাত অভিনেতা ও পরিচালক ছিলেন জিতেন্দ্র চক্রবর্তী অর্থাৎ লাবড়া চক্রবর্তী (মোক্তার)।

মুন্সিগঞ্জের আব্দুল হাই তখন রেডিওতে, পরে টেলিভিশনে গান গাইতেন। স্থানীয় অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশনের জন্য সুপরিচিত ছিলেন বীণা ব্যানার্জী। আবদুস সামাদ (পরে কৌতুক অভিনেতা টেলিসামাদ বলে পরিচিত), যতদূর মনে পড়ে আবদুল হাইয়ের ছোট ভাই, তখন সবে নাটক করতে শুরু করেছিলেন। রঙ্গলাল সেন বলে এক পরিচিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন আমাদের পাড়ায় যিনি খুব ভাল বক্তৃতা করতে পারতেন, অত্যন্ত ভাল আবৃত্তিও করতেন। আজও মনে পড়ে ধবধবে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরে স্বভাবসুলভভাবে বাঁ বাহুখানা ভাঁজ করে পেছনে পিঠের দিকে বিশেষ এক পরিচিত ভঙ্গিতে রেখে মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন তিনি স্বচ্ছন্দে। স্বচ্ছন্দে মনে হতো বটে! তবে সারাক্ষণ পেছনে এক আঙ্গুলের নখ দিয়ে আরেক আঙ্গুল খুঁটে খুঁটে প্রায় রক্ত ঝরিয়ে ফেলার উপক্রম করতেন তিনি। লোকে বলত এটা তার মুদ্রাদোষ অথবা নার্ভাসনেস। রঙ্গলাল সেনের কাছে রবীন্দ্রনাথের ‘আফ্রিকা’, জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ ও নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা আবৃত্তি করতে শিখেছিলাম সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার জন্য। সঠিক উচ্চারণ ও কণ্ঠের ওঠানামা শেখা যে এতটা কষ্টকর হবে আগে বুঝিনি। হরগঙ্গা কলেজের লাইব্রেরিতে তখন পরিমল ভট্টাচার্য অর্থাৎ ‘কালুদা’ কাজ করতেন। তার উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় বই পড়ার আগ্রহ বেড়েছিল অনেকেরই। তিনি বেছে বেছে ভাল বই এনে দিতেন আমাদের সবাইকে। মুন্সিগঞ্জে তখন আরও ছিলেন আমাদের সবার প্রিয় সফি ভাই (সফিউদ্দিন আহমেদ) যিনি মফস্বল সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ছিলেন, যার কথা পরে বিস্তৃতভাবে লিখেছি।

(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here