বিক্রমপুরে রাজা হরিশ চন্দ্রের দীঘি

horishchandra-11-1024x576

২ অক্টোবর ২০১৬ (মুন্সিগঞ্জ নিউজ ডেস্ক) : মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার প্রধান সড়ক থেকে ধলাগাও হয়ে পশ্চিমে রাজা হরিশচন্দ্রের রহস্যময় সেই দীঘি।

জনশ্রুতি মতে কেউ কেউ এটাকে মাঘি পূর্ণিমার দীঘিও বলে থাকে। এই দীঘিকে ঘিরে অনেক কথা ও কিংবদন্তির জন্ম দিয়ে বেঁচে আছে এই আলোচিত দীঘি।
এখানে দীঘির জন্মকাল কেউ বলতে পারে না। সবাই বলে আমাদের পূর্ব পুরুষের আগ থেকেই বৌদ্ধ রাজা হরিশচন্দ্র এ দীঘিটি কাটেন। মাঘি পূর্ণিমাতে এ দীঘি রহস্যময় হয়ে উঠে।

মাঘি পূর্ণিমাতে এই দীঘির পাড়ে দূর দূরন্ত থেকে লোকজন এসে জড়ো হতে দেখা গেছে। সেদিন চারপাশে জমে ওঠে মাঘী পূর্ণিমার মেলা। মুড়ির মোয়া থেকে সংসারের নিত্য প্রয়োজনীয় তামা কাসার আসবাব পর্যন্ত বিক্রি হয় এ মেলায়। আগরবাতি, মোমবাতি তো দু’পা এক’পা এগুলেই পাওয়া যায়।

এ দিনটিতে যারা আসেন তারা সবাই মনে মনে মানত মেনেই আসেন। কিংবা গেলো বছরের মানতের ফল পেয়ে তার ভোগ নিয়ে আসেন। কারো চাকরি নেই, ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে, কারো বা সন্তান হয়ে মারা যায়, আবার কারো কারো পালের গরু টেকেনা, কেউ কেউ প্রেমিক প্রেমিকার মন পাচ্ছে না ইত্যাদি হাজারো রকমের আশা নিয়ে তারা জড়ো হয় এখানে।

দীঘির পাড়ে পাড়ে মোম আর আগরবাতির কি এক অদ্ভুত মজার ব্যাাপার এই যে, মোরগ, খাসি বা টাকা ও অলঙ্কারের মানত কেউ স্পর্শ ও করে না। পাছে কোন অনিষ্ট হয় এই ভয়।

কিন্তু মেলা শেষে এ সবের এক রত্তিও আর চোখে পড়ে না। কোথায় যায় কেউ জানে না। এ নিয়ে আরো এক রহস্য ঘনীভূত হয়ে উঠে মানুষের মনে। ঘটনা এইরূপ সারা বছরই এ দীঘির জলের উপর ঘন ঘাসের একটা আবরণ থাকে এবং তা থাকে সম্পূর্ণ তীর পর্যন্ত। (দীঘির চারপাশে দেড়হাত করে পরিস্কার টলমলে জল দেখতে পাওয়া যেতো)। আশেপাশের লোকজন গরু ছাগলের প্রয়োজনে সেই সব ঘাস কেটে নিয়ে যেতো। বাঁশ ফেলে তারা ঘাসের উপর দিয়ে এপার থেকে ওপারে যেতো। কেউ বা (যারা শুধু দেখতে যায়) মনের আগ্রহে এপার থেকে ওপার হেঁটে পার হতো। অগ্রহায়ণ থেকে মাঘের পূর্ণ শশীর দিন পর্যন্ত ঘাসের একটি অংশ ক্রমশঃ পানির নীচে চলে যেতে থাকে। কিংবা পানি উঠে আসে ঘাসের উপরে (এক এক বছর এক এক অংশ এভাবে ডুবে থাকতে দেখা গেছে। পূর্ণিমা দিন শেষ হতেই আবার তা পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে।
কোন বছর এর ব্যতিক্রম হয়নি বলেই ফি বছর এখানে লোকের ভিড় জমে ওঠে। এ ঘাসেরই একটি পাতা খুবই সুস্বাদু এবং গন্ধময়। লোকেরা তা এনে পানের সাথে খায় এবং অজ্ঞাত কল্যাণের আনন্দে পুলকিত হয়ে উঠে। দীঘির পাড়ে বসতী, এমন এক বয়স্কা মহিলাকে এ সম্পর্কে (দীঘি) জিজ্ঞেস করা হলে সে যা বললো, তা নিম্নরূপ আমরা শুনেছি বৃটিশ সরকার সাতটা দমকল দিয়েও এর জল সেচে শেষ করতে পারেনি। সারাদিন কল চলার পর পরদিন সকালে দেখা গেছে জল পূর্বাবস্থায়ই আছে। তারও আগে কোন এক জমিদার হাতী এবং লোকজন নিয়োগ করেছিল এটাকে পরিস্কার করার জন্য। পরিস্কার তো হয়নি বরং হাতী এবং নিরীহ খেটে খাওয়া মানুষগুলো অপঘাতে মরেছে। আর তাই নাকি এই নোটিশ বোর্ডটি টাঙানো হয়েছিল। সবই কিংবদন্তি।
সে আরো বললো-আমরাও কম অত্যাচার ভোগ করিনি এ দীঘির। প্রথম প্রথম না বুঝে এর উপর ময়লা এবং আর্বজনা ফেলতাম। একদিন রাতে দেখলাম কে একজন এসে আমাকে বলছে, ‘এ দীঘির সেবা কর, নইলে তোদের ক্ষতি হবে।’ আমল দিইনি তাই, সংসারে নেমে এলো রোগশোক, পালের মড়ক। গরু ছাগল, সব একদিনেই হারালাম। একটা ছেলে হঠাৎ পাগল হয়ে গেলো। অনেক ক্ষতি হয়ে গেলো আমার। কোনরকম কান্না চাপিয়ে তিনি বলে যেতে লাগলেন। ‘তারপর থেকেই প্রতি বৃহস্পতিবার মোমবাতি, আগরবাতি এবং আরো বিভিন্ন উপায়ে একে সেবা করছি আর খুশী রাখছি। তবুও তো ভুল-ভাল হলে রাতে তা বলে দেয় এবং যতোদুর ক্ষতি করার তা করেই।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here