মুন্সিগঞ্জের বিয়ে সংস্কৃতি

গোলাম আশরাফ খান উজ্জ্বল, ৬ এপ্রিল ২০১৭ (মুন্সিগঞ্জ নিউজ ডটকম) : DSC01662বিয়ে মানুষের ধর্মীয়, সামাজিক ও জৈবিক অধিকার। একজন পরিপূর্ণ যুবক যুবতী ধর্মীয় নীতি অনুসারে একে অপরের সাথে সহাবস্থানে থাকা খাওয়া ভরণ পোষণে রাজি থাকাকে বিবাহ বন্ধন বলে। এ বিবাহ অনুষ্ঠানে কিছু সামজিক, ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় রীতিনীতি মেনে বা গ্রহণ করে বিবাহ সম্পন্ন হয়। যেমন মুসলিম রীতিতে মুসলমানের বিয়ে, হিন্দুরীতি মেনে হিন্দু বিয়ে এবং খিৃষ্টান নিয়মানুসারে খ্রিষ্টান বিয়ে সম্পন্ন হয়। আবার কিছু প্রথা মেনে চাকমা, গারো, ত্রিপুরা, মনিপুরী, মারমা ও রাখাইনদের বিয়ে হয়। ‘‘বেদে’’ তাদের বিয়ে হয় সর্ম্পূণ তাদের রীতিতে। আমাদের মুন্সীগঞ্জে মুসলমান, হিন্দু, খ্রিষ্টান এবং বেদে সম্প্রদায়ের লোক বাস করে। আমাদের আলোচ্য বিষয় থাকবে এ তিন সম্প্রদায়ের লোকদের ‘‘বিয়ে’’ বা ‘‘বিবাহ’’ সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা। মুন্সীগঞ্জ জেলার মোট জনসংখ্যার ৮৫ ভাগই মুসলমান। হিন্দুদের সংখ্যা ১০ ভাগ। বেদে ৩ ভাগ এবং খ্রিষ্টান ২ ভাগ। মুন্সীগঞ্জ জেলায় মোট জনসংখ্যা ১৬ লাখ। জেলার সিরাজদিখান এবং মুন্সীগঞ্জ সদর থানায় খ্রিষ্টানদের বাস রয়েছে। তবে সিরাজদিখানের শুলপুর এলাকায় খ্রিষ্টানদের বসবাস বেশী। মুন্সীগঞ্জ সদর, টঙ্গীবাড়ী লৌহজং, এ তিন উপজেলায় বেদেরা নৌকায় বেশী বসবাস করে। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী মেয়ের বিয়ের বয়স সর্বনি¤œ ১৮ বছর। অর্থাৎ ১৮ বছর হলেই মেয়ের বিয়ের বয়স। আর ছেলের ২০ বছর বা তদোর্ধ। ছেলেমেয়ে বড় হলে, ছেলে মেয়ের অভিভাবকেরা ঘটক বা আত্মীয় স্বজনের মাধ্যমে পাত্র বা পাত্রী দেখতে যায়। পাত্র-পাত্রী পাশাপাশি বাড়ি, কাছের বা দূরের গ্রাম, অন্য ইউনিয়ন বা অন্য থানা এবং জেলার হতে পারে। ইসলামে যাদের বিয়ে করা হারাম বা নিষেধ, তাদের ব্যতিত বিশ্বের যেকোন মুসলিম যুবক মুসলিম যুবতীকে ইসলামি আইনে বিবাহ করতে পারবে। পাত্র-পাত্রী পছন্দ হলেই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। বিয়ের দিন তারিখ নির্ধারণ হলে উভয় পরিবারে শুরু হয় আনন্দ। আত্মীয় স্বজনরা আসতে থাকে বর কনের বাড়িতে। বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে ব্যয় বহুল বিয়ে হয় মুন্সীগঞ্জ বিক্রমপুর অঞ্চলে। বিয়ের কয়েকদিন আগ থেকে আনন্দ হয় বিয়ে বাড়িতে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে হয় বিয়ের গীত। যেমন ‘‘হোগলা পাতার বেড়া রে ঝিলমিল ঝিলমিলরে করে। ওরে ময়না তোরে নিবে স্বামীর বাড়িরে। আবার গীত গায়-অত দিনও ছিলারে হুলুদ ঝোপঝাড় জঙ্গলে আজ কেন আইলারে হলুদ মল্লিকার বরণে। ‘‘আবার ‘‘সেই না বাঁশির সুরেগো-সেইনা বাঁশির টনে গো-কালাচাঁন কী বাজায় মোহন বাঁশি। এছাড়া বাংলা ছায়াছবিতে একটি গান রয়েছে তাও বিয়ে এবং গায়ে হলুদের দিন গাওয়া হয়। হলুদ বাটো মেন্দি বাটো, বাটো ফুলে মৌ। এমনই অনেক বিয়ের গীত গাওয়া হয় গায়ে হলুদ এবং বিয়ের গোসলের সময়। শহরে আবার ভিন্ন চিত্র। বিয়ে গীত গান দাদী, চাচী, মামী এবং ভাবীরা। মুন্সীগঞ্জের বিয়েতে আলোকসজ্জা করা হয়। করা হয় পেন্ডেল ও মঞ্চ। অতিথি বা বরযাত্রীদের খাবারে দেয়া হয় রোস্ট, চিংড়ি ভাজা, রুই মাছের ভাজা, মুরগী ফ্রাই, কখনো কখনো থাকে সবজী, পোলাও, ঝাল গরুর মাংস, খাশীর মাংস, বোরহানী, দই, জর্দা সব শেষে পান। বিয়েতে বর-কনের জন্য আস্ত একটি মুরগী বা মোরগ ফ্রাই করা হয়। যাকে মুন্সীগঞ্জের ভাষায় সাগরআনা বলা হয়। ছেলেকে মানে বরকেও পোশাক দেয়া হয় শ্বশুর বাড়ি হতে। তবে সবচেয়ে খারাপ কথা হলো মুন্সীগঞ্জ বিক্রমপুর যৌতুক প্রবণ এলাকা। মাঝে মধ্যে বাল্য বিবাহ ঘটে থাকে। এক সময় বিয়ের বাহন থাকতো পালকী, ঘোড়ার গাড়ী এবং বর্ষার সময় নৌকা। এখন বিয়ের বাহন হিসেবে মটর গাড়ী ও প্রাইভেট কার ব্যবহার করা হয়।
[লেখক, ইতিহাস গবেষক]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here