মুন্সিগঞ্জের মাইক ব্যবসায়ী ও পুরাতন গানের সংগ্রহকারী-মো: হাফিজ উদ্দিন (ভিডিওসহ)

মুন্সিগঞ্জের মাইক ব্যবসায়ী ও পুরাতন গানের সংগ্রহকারী-মো হাফিজ উদ্দিন

মোহাম্মদ সেলিম ও অনু ইসলাম: ৯ ডিসেম্বর ২০১৭, মুন্সিগঞ্জ নিউজ ডটকম: ছবির মানুষটিকে দেখে অন্তত মুন্সিগঞ্জের অনেকেই তাকে চিনে থাকবেন। সে হচ্ছে আমাদের প্রিয় হাবিব ভাই৷ মুন্সিগঞ্জ প্রধান সড়কের কাচারীঘাটের সাবেক পিনাকী স্টুডিওয়ের পূর্ব পাশে ষাটের দশকে আশা মাইক সার্ভিস কলের গানের যৌথ ব্যবসা শুরু করে ছিলেন এই হাবিব ভাই। এই ব্যবসায় তার সফলতা ছিল সেই সময়। একাধিক গ্রামে তার ভক্ত নির্ধারিত গ্রাহক ছিল। তার মাইকের জন্য তার ভক্তরা বিয়ের তারিখ পরিবর্তন করেছেন বলে হাবিব ভাই এমনটা জানিয়েছেন।

20992883_1437546329669916_5764940856012471281_nপড়ালেখায় ক্লাসে রোল নং দ্বিতীয় থাকলেও মেধাবী এই হাবিব কে গানের জগতে টেনে নিয়ে গেছে জীবনের ধারা। নিজে গুনগুন করে গান গাইতে পারলেও শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি নেয়ার কোন দিন চেষ্টা করেন নি। হাজারো বাঁধা তাকে গান থেকে সরাতে পারেনি। গানের মায়ার জালে জড়িয়ে হাবিব ভাই কলের গানের ব্যবসা ধরেন।
বর্তমানে পিনাকী স্টুডিও নেই। আশা মাইক সার্ভিসও নেই। পিনাকী স্টুডিওয়ের স্থানে এখন শোভা পাচ্ছে আনন্দ হোটেল। কালের আবর্তে অতিত সব এখন হারিয়ে যাচ্ছে।
এই সময়ে নারী সাংবাদিকতায় উচ্চ শিখরে অবস্থান করছেন মুন্নী সাহা। এই মুন্নী সাহা’র পরিবাররা থাকতেন পিনাকী স্টুডিওয়ের দ্বিতীয় তলায়। সকালে আশা মাইকের গান শুনে তাদের ছেলেবেলায় ঘুম ভাঙ্গতো। কখনো কখনো গানেরর কারণে তাদের পড়ালেখার সমস্যা হতো।

20993066_1437546203003262_5268486734639843633_nতখন মুন্নী সাহা ওপর থেকে পানি ছুড়ে মারতো বলে এমনটাই জানান হাবিব ভাই। হাবিব ভাইয়ের কলের গানের বিষয়ে মুন্নী সাহা একটি জাতীয় পত্রিকায় প্রতিবেদন লিখেছেন। সেখান থেকেই হাবিব ভাই জানতে পারেন যে মুন্নী সাহা পড়ালেখার সমস্যার কারণে তাদের দিকে পানি ছুড়ে মেরেছেন।
সম্পর্কটা আত্মার হলেও বন্ধুত্বে বয়স কোন বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি৷ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার দাবিতে হাবিব ভাই কে হাবিব ভাই বলেই সম্মোধন করে ডাকার অধিকার অর্জন এই কাজে প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হাবিব ভাই একজন গান প্রিয় মানুষ৷ গানকে ভালোবেসে কিংবা বলা যেতে পারে গান কে ভালোবাসতে বাসতে সেই ষাটের দশক সময় হতে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত মাইক, কলের গান, রেকর্ড প্লেয়ার, অডিও এবং পরবর্তীতে সিডি প্লেয়ার এসব নিয়ে ব্যস্ততম সময় অতিবাহিত করেছেন এই পেশায়। এক দিকে ব্যবসা অন্যদিকে মনের তৃষ্ণা মিটানোর জন্য তিনি এই কলের গানের কাজ বেছেনেন৷ এখন অবশ্য তিনি অবসর সময় যাপন করছেন৷ তবু গান তিনি ছাড়েন নি৷

24273299_1524501537641061_1675230802_nবাড়িতে গানের বিশাল সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছেন। রাতে শোয়ার আগে তিনি পুরানো দিনের গান শুনে ঘুমাতে যান।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও শখ হিসেবে থেকে গেছে তার পুরাতন গান, গান সংশ্লিষ্ট জিনিসপত্র এবং অন্যান্য জিনিসসমূহ সংগ্রহ করা৷ অনেক বিখ্যাত বিখ্যাত সুরকার ও শিল্পীদের গানের রেকর্ড তার সংগ্রহশালায় শোভা পাচ্ছে। এগুলো খুব যতœ করে তিনি রেখেছেন৷
এখনো সময় সুযোগ হলে অনুসন্ধান করেন পুরাতন গানের রেকর্ড কিংবা পুরাতন জিনিস৷ অনেকে আবার তার কাছে দূর দূরান্ত হতে ছুটে আসেন এসব পুরাতন গানের সংগ্রহ করতে৷ অনেকবার তার এই দুর্লভ সংগ্রহ দেখতে ইচ্ছা পোষণ করেছিলাম৷ সময় সুযোগ হয়ে উঠেনি৷
গত দুইদিন আগে হাবিব ভাই আমার কর্মস্থলে আসেন একটা ম্যাগাজিন নিয়ে৷ সাপ্তাহিক ২০০০৷ সংখ্যাটি ১৬ মার্চ ২০০১সালের৷ সেখানে সারেগামা কোম্পানি হয়ে উঠার ইতিহাস লেখা৷ আগে ছিলো এইচএমভি ৷ সেখানে দেখলাম বিখ্যাত শিল্পীদের সেই কোম্পানির গান রেকর্ড করার ইতিহাস বর্ণনা৷ গহরজান, ইন্দুবালা দেবী আঙ্গুরবালা দেবী, লালা চাঁদ বড়াল , মালকা জান, কমলা ঝরিয়া, কানন দেবী, বেগম আখতার, শচীন দেব বর্মণ,হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে , সতীনাথ মুখোপাধ্যায়,কিশোর কুমার, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়দের নাম৷

20994141_1437546139669935_2204467699092059812_nএরা সকলেই সেই বিখ্যাত কোম্পানিতে গানের রেকর্ড করেছেন৷ ভারতবর্ষের সর্ববৃহৎ এবং সর্বপ্রথম এই রেকর্ডিং কোম্পানি জানতে পারলাম৷ কপিটি সংরক্ষণ করলাম তার অনুমতি নিয়ে৷ যাই হোক, হাবিব ভাই আবার গতকাল আসলেন আমার কর্মস্থলে৷ এসে জানালেন আগামীকাল তার সংগ্রহশালা দেখাবে৷ লোভ সামলাতে পারলাম না৷বললাম যাবো৷ সেই সুবাদে আজ সকালে তার বাড়িতে গেলাম৷ তার বাসা শহরের পাঁচঘড়িয়াকান্দি গ্রামে৷ বাড়িতে যাওয়ার আগে ফোনে কথা হলো৷ সে শহরের কাচারী ঘাট এলাকাতেই ছিলেন৷ আমি আর অয়ন সাঈদ দুজনে দেখা করে তার বাড়িতে গেলাম৷ প্রায় ২ ঘন্টা আড্ডা দিলাম, গান শুনলাম এইসব রেকর্ডে৷ সবকিছু আমাদের দুজনকে দেখালেন এবং অবগত করলেন৷
গান শুনলাম শিল্পী মোহাম্মদ রফিক , শচীন দেব বর্মণ এবং রেজা মজিদ এর৷ হাবিব ভাইয়ের এমন চমৎকার এবং দুর্লভ গানের রেকর্ড সংরক্ষণ সত্যি অভাবনীয়৷ হাবিব ভাই, সত্যি একজন ভালো গান সংগ্রাহক এবং প্রেমিক৷ আনুমানিক প্রায় সাড়ে তিনশতর মতো গানের রেকর্ড তার সংগ্রহে আছে সাথে আরো আছে অডিও ও সিডি ক্যাসেট৷ হাবিব ভাইকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা৷ দীর্ঘায়ু হোন, প্রিয় মানুষ৷
এই প্রতিবেদনের ছবি ও লেখার বেশিরভাগ অংশই কবি অনু ইসলামের ফেসবুক থেকে নেয়া হয়েছে।
হাবিব ভাইয়ের ওপর লেখার ইচ্ছা অনেক দিন ধরে লালন করছিলাম। কিন্তু সময়ের অভাবে তা আর হয়ে উঠেনি। শনিবার ২ ডিসেম্বর ২০১৭ খ্রি: তারিখে আমি মোহাম্মদ সেলিম ও কবি অনু ইসলামকে নিয়ে হাবিব ভাইয়ের বাড়িতে যাই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here