বাংলার প্রাচীন রাজধানী বিক্রমপুর পতন বা ধ্বংসাবশেষ

গোলাম আশরাফ খান উজ্জ্বল, সোমবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, মুন্সিগঞ্জ নিউজ ডটকম:

DSC01662বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা গেছে বাংলার প্রাচীন রাজধানী বিক্রমপুর। বিভিন্ন তা¤্রশাসন, মুদ্রা ও মূর্তির পাদপীঠে লিখিত শিলালিপি হতে প্রমানিত হয়েছে যে, চন্দ্র, বর্ম ও সেনরাজাদের প্রধান রাজধানী ছিল বিক্রমপুরে যা আজ মুন্সিগঞ্জ জেলা।

প্রাচীন বিক্রমপুর বলতে মুন্সিগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুরের কিয়দাংশ, নারায়ণগঞ্জ সদর, ফতুল্লা, শ্যামপুর, ঢাকার দোহার নবাবপুর, গালিমপুরকে বুঝায়। অর্থাৎ পশ্চিমে গঙ্গানদী, দক্ষিণে বাকলা, বরিশাল, পূর্বে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী, উত্তরে সোনারগাঁও।

মহারাজাধীরাজ শ্রীচন্দ্র দেবের যে একখানি তা¤্রশাসন মুন্সিগঞ্জে পাওয়া গেছে তা থেকেই উপরোক্ত এলাকার নাম পাওয়া যায়।

নরসিংদী জেলার বেলাবতে আরো একটি যে, তা¤্রশাসনটি আবিস্কৃত হয়েছে, তাও রাজধানী বিক্রমপুর হতে জারীকৃত ও প্রকাশিত। মহারাজ বল্লাল সেন, লক্ষন সেন, মাধব সেন, সুরসেন, বিশ্বরূপ, কেশব সেন, সকলেই বিক্রমপুর থেকে ভূমি দান, মূদ্রাজারী করেছেন। বিশ্বরূপসেন (১২০৬/১২১০) এবং কেশবসেন (১২২০/১২২৩ খ্রিঃ) বিক্রমপুরে বাস করতেন এবং মূদ্রা ও ভূমি দান করেছেন।

এসকল রাজা ও রাজ বংশের রাজধানী শহর বিক্রমপুর। বিদেশী রাজ শক্তির আক্রমণে পতন, বিলুপ্ত বা ধ্বংস হয়েছিল। এয়োদশ শতাব্দির দ্বিতীয়ার্ধে বিক্রমপুর অঞ্চলে সেন শাসনের অবসান ঘটেছিল এবং এক ‘দেব’ রাজবংশের উদ্ভব হয়েছিল বলে ইতিহাস প্রমাণ দেয়। মুন্সিগঞ্জের আদাবড়ী তা¤্রশাসন থেকে দশরথ দেব নামক এক রাজার নাম পাওয়া যায় এ তা¤্রশাসন বিক্রমপুর থেকে প্রকাশিত হয়েছিল।

খুব সম্ভাবত দিল্লীর সুলতান গিয়াস উদ্দিন বলবন তার বাংলা অভিযান কালে ‘‘রায় দনুজ’’ নামক যে, দক্ষিণ পূর্ব বাংলার রাজার সঙ্গে সন্ধি করেছিলেন, তিনিই এই দশরথ দেব। এ কথা গুলো বাংলার ইতিহাস গ্রন্থে ডঃ মুহাম্মদ আঃ রহিম, ডঃ আব্দুল মমিন চৌধুরী প্রমুখ লেখকগণ উল্লেখ করেছেন। এ লেখকগণ আরো উল্লেখ করেছেন, সেন যুগের তা¤্রশাসন সমূহ থেকে এ কথা স্পষ্ট যে, তাদের রাজধানী ছিল ঢাকা জেলার বিক্রমপুর। সেন বংশের পতনের পরই বিক্রমপুর মুসলমানদের হাতে চলে যায়। খুব সম্ভবত ১৪৭৯-১৪৮৩ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান জালাল উদ্দিন আবু জাফর শাহের সময় মহান মালিক কাফুর শাহ বিক্রমপুর হতে সেন রাজবংশের ধ্বংস ও ইতি টানেন।

ঐতিহাাসিক ডঃ সৈয়দ মাহমুদুল হাসান উল্লেখ করেছেন, ‘‘পঞ্চদশ শতাব্দিতে ধন্যমানিক্য গৌড়ের সুলতানের নিকট বিক্রমপুর বিধ্বস্ত করেন।’’ ত্রিপুরার রাজা (কুমিল্লা) ধন্যমানিক্য ১৫১০-১৫১৮ এ আট বছর রাজত্ব করেন। ধন্যমানিক্য ১৫১৮ খ্রিষ্টাব্দের কোন এক সময় বিক্রমপুরের রাজধানী শহর রামপাল আক্রমণ করে বিধ্বস্ত, ধ্বংস করেন কিংবা পতন ঘটান। বিক্রমপুরের সর্বশেষ রাজা কেদার রায় ১৬০৩ খ্রিষ্টাব্দে মুঘল সেনাপতি মানসিংহের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হলে মুঘলরা বিক্রমপুরে একছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। অর্থাৎ বিশাল বিক্রমপুর হারায় তার স্বাধীনতা।

কেদার রায়ের বিক্রমপুর রাজ্যকে মুঘলরা চারটি ভাগে বিভক্ত করে। (১) রায় নন্দন চৌধুরীকে বিক্রমপুরের জমিদারী, (২) কমলশরন ও শেখ কালুকে কার্ত্তিকপুরের জমিদারী, (৩) রাম রাজা সরদারকে মূলপাড়ার তালুক ও (৪) কালীদাস ঢালীকে দেওভোগ তালুক প্রদান করা হয়। অর্থাৎ ১৬০৩-১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে মধ্যে বিক্রমপুর রাজ্যকে চারটি পরগণায় ভাগ করা হয়। এদিকে নতুন একটি তথ্য পাওয়া গেছে ত্রিপুরার রাজা ধন্যমাণিক্য ১৫২৮ খ্রিষ্টাব্দে সুবর্ণ গ্রামে উপস্থিত হন স্বসৈন্যে। তিনি সোনারগাঁও দখল বা করায়ত্ব করেন।

এরপর ত্রিপুরার রাজা নৌ ও সড়ক পথে মুন্সিগঞ্জের প্রাচীন শহর রামপাল আক্রমণ করেন, ধ্বংস ও পতন ঘটান। এ ঘটনা ু১৫২৮/২৯ খ্রিষ্টাব্দের কোন এক সময় ধনমাণিক্য ১৫১০-১৫১৮ ত্রিপুরায় রাজস্ব করেছেন। তিনি ১৫২৮ সালে নয়। আর ধন্যমাণিক্য সে সময় বিক্রমপুর আক্রমণ করেন তখন প্রবল প্রভাপশালী যোদ্ধা সুলতানী শাসকরা বিক্রমপুরে রাজত্ব করছিলেন।

ধন্যমাণিক্য ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, ধলেশ্বরী, শীতলক্ষা পাড়ি দিয়ে বিক্রমপুরের রামপাল আক্রমণেরর প্রশ্নেই ওঠে না। ইতিহাস প্রমাণ দেয়, মুন্সিগঞ্জ বিক্রমপুর বহিশত্রু দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে সবসময় পশ্চিম এবং উত্তর দিক থেকে। ইতিহাস প্রমাণ দেয় ১৪৭৯-১৫৬৫ পর্যন্ত মুন্সিগঞ্জে সুলতানী শাসকদের নিয়ন্ত্রণে। এরপর ১৫৬৫ থেকে ১৫৭২ পর্যন্ত পাঠান কররানী শাসকদের অধীনে ছিল বিক্রমপুর। ১৬০৩ সালের পর কখনো মুঘল কখনো বার ভূইয়াদের নিয়ন্ত্রণে ছিল বিক্রমপুর। কখনোই ত্রিপুরার নিয়ন্ত্রণে ছিল না।

১৬০৮ সালে সমগ্র মুন্সিগঞ্জ বিক্রমপুর মুঘলদের সরাসরি শাসনে চলে আসে। তবে সুলতানী, পাঠান, মুঘল ও ত্রিপুরার আক্রমণে প্রাচীন শহর রামপাল বা বিক্রমপুরের পতন ঘটে বা বিলুপ্ত হয়। বাসুদেবের পুত্র অধিরাজ দনুজ মাধব দশরথীদেব ১২৩১ সালে বিক্রমপুর ভূমি দান করেন।

স্মৃতিসময়সে বিক্রমপুরে এখনো মহারাজ বল্লাল সেনের বাড়ী, হরিচন্দ্র/হরিবর্মার দিঘি, মালিক কাফুর শাহের মসজিদ, সুলেমান কররাণীর টেঙ্গর মসজিদ কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে বিক্রমপুর মুন্সিগঞ্জ বাসীর ধারনা বাংলার প্রাচীন রাজধানী বিক্রমপুর মুঘলদের দ্বারাই ধ্বংস সাধিত হয়।

মুঘলদের সেনানীবাস বা কেল্লা ইদ্রাকপুর দুর্গ এখনো মুন্সিগঞ্জ শহরে অবস্থিত আছে। বিক্রমপুরকে বুকে ধারণ করেই মুন্সিগঞ্জ এগিয়ে যাচ্ছে মহাকালের দিকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here