লালন ফকির: বাউল সম্রাট

গোলাম আশরাফখান উজ্জ্বল, বুধবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৮, মুন্সিগঞ্জ নিউজ ডটকম:

kabirkabir_1350462436_1-vagabond201111241322148203_lalon“খাচার ভিতর অচিন পাখি/ কেমনে আসে যায়/ তারে ধরতে পারলে মনবেড়ী/ দিতাম পাখির পায়/” অথবা “বাড়ির পাশে আরশি নগর/ সেথায় একঘর পরশী বসত করে/ আমি একদিনও না দেখিলাম তারে/” এমনই অজ¯্র গানের রচয়িত বাউল কবি লালন ফকির। ভক্তরা আবার তাকে লালন সাঁই বলে ডাকেন।

কিন্তু তার প্রকৃত নাম হলো লালিত নারায়ণ কর। ডাক নাম লালু। পিতার নাম মাধবকর আর মায়ের নাম পদ্মাবতী। জন্মস্থান কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালীর ভাঁড়ারা গ্রামে। জন্ম নেন ১৭৭৪ সালে। ছোট বেলাতেই লালন তার বাবা মাকে হারিয়ে অনাথ হন। অনাদর অবহেলায় খেয়ে না খেয়ে চলতে থাকে তার জীবন। একেবারেই অসহায় এ কিশোর বাড়িতে বাড়িতে কাজ করে জীবন যাপন করছিল। এভাবেই চলতে থাকে লালনের জীবন। একবার বের হলেন তীর্থ যাত্রায়। পথেই গায়ে দেখা দিল বসন্ত রোগ।

এ রোগটি সে সময় ছিল খুব ভয়ানক। লালনের সাথীরা তাকে ফেলে চলেগেল। অসুস্থ ও রোগাক্রান্ত অবস্থায় তার সাহায্যে এগিয়ে এল মলম ফকির। সে ছিল সিরাজ সাঁইয়ের শিষ্য। হরিনারায়নপুর ছিল সিরাজ সাঁইয়ের আখড়া। সেখানে সিরাজ সাঁইয়ের সাথে পরিচয় ঘটে লালন ফকিরের। লালন সিরাজ সাঁইয়ের শিষ্য হিসেবে নতুন জীবন শুরু করেন। অসুখ থেকে বেঁচে গেলেও বসন্তের দাগ সারা শরীরে থেকে গিয়েছিল। তার চেহারা হয়েছিল বীভৎস। এটা যে লালন তা কেউ চিনতে পারল না। একটি চোখও নষ্ট হয়ে গিয়েছিল তার। সুস্থ্য হয়ে বাড়ি ফিরে এলেন। কিন্তু যখন শুনল লালন মুসলমানের ঘরে থেকেছে। তখন লালনের হিন্দুসমাজ জাত গেল এই অজুহাতে তাকে আর আশ্রয় দিল না। মনের দুঃখে লালন নিজ গ্রাম ছেড়ে আবার ফিরে এলেন মলম কারিগরের বাড়িতে। মলম কারিগরকে লালন বাবা বলে ডাকলেন পালক পিতা তাকে বিনা দ্বিধায় গ্রহণ করলেন। শুরু হলো লালনের পরিবর্তিত আরেক জীবন। লালন ফকির বাউল জীবন শুরু করলেন। হরি নারায়নপুরেই আখড়া গাড়লেন লালন সাঁই। তিনি গান রচনা ও নিজের মতো করে সুর দিতেন।

তাঁর গানের ভক্ত দিনদিন বারতে লাগল। তিনি নিজে গাইতেন ভক্ত শিষ্যদেরও শিখাতেন। দূর বহু দূর থেকে লালনের গান শোনার জন্য আসত লোকেরা। আস্তে আস্তে ভরে উঠতে লাগল আখড়া। লালন ফকির বা দরবেশ হিসেবে খ্যতি লাভ করতে লাগলেন। বাংলা ভাষাভাষির এলাকায় লালন ফকির সাধক কবি হিসেবে সুনাম অর্জন করলেন। তাঁর লেখা গানের পরিচিতি হলো- “লালনগীতি” হিসেবে। আধ্যাত্মিক ও দেহতত্ত্ব গানই বেশী রচনা করেছেন লালন সাঁই। তাঁর পালক পিতা ১৭ বিঘা জমি দান করেছিল। সেই জমিতিই লালনের সমাধিসৌধ ও আখড়া নির্মিত হলো। প্রতি বছর শীতের সময় আখড়ায় বসে বাৎসরিক গানের উৎসব। বড় ধরনের মেলা হতো।

যা আজো হয়। লালন ফকির বেঁচে ছিলেন ১১৬ বছর। ১৭ অক্টোবর ১৮৯০ সালে তিনি ছেঁউড়িয়া আখড়াতেই মারা যান। সেখানেই লালনকে সমাহিত করা হয়। লালনের মৃত্যুর পর তাঁর গানও জীবন ধারা নিয়ে আলোচনা হয়। সাধক কবি লালন ফকিরকে নিয়ে প্রথম এগিয়ে আসেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বরীন্দ্রনাথ অনেক কষ্ঠে এবং বহু খোঁজের পর লালনের একটি গানের খাতা আবিস্কার করেন। লালনের গানগুলো তাঁর ভক্তের হাতে লেখা ছিল। তিনি লালন ভক্ত গায়কদের কাছ থেকে লালনের বেশ কিছু গান সংগ্রহ করেন।

বিশ্বসাহিত্য অঙ্গনে রবীন্দ্রনাথই প্রথম লালন ফকিরকে বিশ্বসাহিত্যে পরিছয় করিয়ে দেন। সাধক কবি লালন সাঁই নিরক্ষর ছিলেন। কিন্তু তাঁর গানের বাণী ও সুর কত সহজ। শ্রুতি মধুর এবং চমৎকার ভাবধারার গানগুলো এখনো মানুষের মুখে মুখে চির অম্লান। লালন ফকিরের এ গানগুলো ভোরের ফোঁটা ফুলের মতো তাজা ও আকর্ষণীয়। লালন বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির মূল্যবান এক সম্পদ।

( লেখক: সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক)

সহযোগীতাঃ-

লালনফকির-ড. মোহাম্মদ এনামুল হক
কুষ্টিয়া জেলার ইতিহাস জেলাপ্রশাসন কুষ্টিয়া (১৯৯১)
আমাদের লালন-ইভা ফারহানা।
নবারুণ পত্রিকা- এপ্রিল ২০০৯
লালন সাঁই- মীর মোশাররফ হোসেন
লালন সাঁইয়ের আখড়া- অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here