মুক্ত বাংলার প্রথম সূর্যোদয় মুজিবনগরে

১লা অক্টোম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার, মুন্সিগঞ্জ নিউজ ডটকম:

আতিয়া পারভীন :

download (8)“বাংলাদেশ” আহ্ শান্তি! আসলে নামটা উচ্চারণ করে আজ যত প্রশান্তি যত সহজে অনুভব করি, এত সহজে যে নামটা পাওয়া যায়নি, তা আমার মনে হয় এদেশের আলো হাওয়ায় সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুটিও বোধ হয় জানে। আর এই মহান নামের সাথে আজ যেসব নাম স্বগর্বে জড়িয়ে আছে তার মধ্যে মুজিবনগর একেবারে শুরুতেই এসে যায়।

১৯৭১ সালের পর আর যুদ্ধ আটকাবার কোন পথ খোলা ছিল না তখন যুদ্ধ পরিচালনার খুবই জরুরী হয়ে পড়েছিল বাংলাদেশ সরকার গঠন করা এবং তা আনুষ্ঠানিক ভাবেই। কিন্তু অনেক মুশকিলের মধ্যেই একটি মুশকিল বড় হয়ে দাঁড়ায়, তা হলো স্থান নির্বাচন। তৎকালীন নেতৃবৃন্দ সরকারের মোটামুটি একটা রূপরেখা দাঁড় করিয়েও কোথায় শপথ নেবেন সেটা ঠিক করতে দ্বিধায় পড়েন। কারণ পাকবাহিনী প্রায় সবই দখল করে রেখেছিল।

তাছাড়া ছিল বড়সড় হামলার ভয়। এছাড়াও তাজউদ্দিন আহমেদ ও অন্যান্যরা বাংলার মুক্ত মাটিতেই এ সরকারের আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ ও সুর্নিদিষ্ট ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিশ্ব দরবারের কাছে স্বাধীনতার ঘোঘণা দেয়ার পরিকল্পনা করেন। তখন সবদিক বিবেচনা করে ভারতের প্রবেশমুখে দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গণের সুদৃঢ় অবস্থান, কুষ্টিয়া যুদ্ধে সাফল্য, মেহেরপুরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কথা চিন্তু করে এই এলাকাতেই শপথ গ্রহণের আরোহন চলতে থাকে। সেই মোতাবেক চুয়াডাঙ্গায় প্রস্তুতি চললেও জানাজানি হয়ে যাওয়ায় চুয়াডাঙ্গায় পাক-বাহিনী বোমা হামলা শুরু করে।

যার ফলে দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গণের সদর দপ্তর চুয়াডাঙ্গা থেকে সরিয়ে মেহেরপুরে নেয়া হয়। এরূপ দুঃসময়ে নেতৃবৃন্দ ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর সাথে আলোচনা সেরে, মেহেরপুরের সীমান্তবর্তী গ্রাম বৈদ্যনাথ তলার বিশাল আ¤্রকাননের ছায়াঢাকা পাখিডাকা চত্বরকেই বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণের জন্য এবং এখানেই অস্থায়ী রাজধানী স্থাপনের জন্য উপযুক্ত বলে ঘোষণা করেন।
চুয়াডাঙ্গা এবং মেহেরপুর থেকে এ স্থানের দূরত্ব ও স্থলপথে যাতায়াত অসুবিধা এবং মাত্র ১০০ গজের মধ্যে ভারতীয় সীমান্ত সড়ক পথে কলকাতার সাথে যোগাযোগের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই বৈদ্যনাতলাকেই বেছে নেয়া হয়।

এছাড়াও বৈদ্যনাথতলার ভৌগলিক অবস্থানটিও এমন যে পাকবাহিনী যদি আকাশপথে বিমান হামলা করতে চায় তা হলেও ভারতীয় আকাশসীমায় প্রবেশ করতে হবে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে, সেই ঝুঁকি নেবে না সেটাও সবাই বুঝেছিলেন।
বৈদ্যনাথতলার একটা কিছু অনুষ্ঠানের আভাস পাওয়া যায় ১২ এপ্রিলের দিকে। সেই আভাস দেয়া হয় বৈদ্যনাথতলা সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দকে। ভারতীয় বিএসএফের মাধ্যমে জানানো হয় এ সংবাদ। তারপর মহা উদ্যমে চলে বাগান পরিষ্কার পরিচ্ছন্নের কাজ। বর্তমানে সেই স্থানেই র্নিমিত হয়েছে স্মৃতিসৌধ।

অবশেষে ১৫ই এপ্রিল সংগ্রাম কমিটির সদস্যগণ জানতে পারেন সুসংবাদ। ১৭ই এপ্রিল হবে এই সোনার মাটিতে শপথগ্রহণ। বাংলার ইতিহাসের অংশ হবে বৈদ্যনাথতলা। ১৭ই এপ্রিল ১৯৭১ হবে সোনালী দিন। শুরু হয়ে গেল মহাযজ্ঞের আয়োজন। কিন্তু সাধের সাথে সামর্থ্যরে মিল নেই। সাদামাটা চৌকির মঞ্চ যা আবার আনা হয়েছিল ইপিআর ক্যাম্প থেকে। হাতল ভাঙ্গা, পা নেই এমন কিছু চেয়ার টেবিল আর বাঁশের পাতার বেষ্টনী। কিন্তু চরম উৎসাহ আর উদ্দীপনায় সমস্ত আয়োজন সমাপ্ত হলো।

১৭ই এপ্রিল সকাল ৯টায় পৌঁছে গেলেন তাজউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কর্ণেল ওসমানীসহ অনেকেই। বেলা ১১টা নাগাদ শুরু হয় শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। ইপিআর ও আনসারের একটি ছোট্ট দল অভিবাদন জানায়। অভিবাদন গ্রহণ করেন সৈয়দ নজরুর ইসলাম। তিনিই বৈদ্যনাথতলায় প্রথম বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। স্থানীয় শিল্পীরা গেয়ে ওঠেন “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি………”।

পাখির গানের সাথে মিশে আকাশে বাতাসে ধ্বণিত হতে থাকে সেই সুর। পতপত করে উড়তে থাকে লাল সবুজের পতাকা বাংলার মুক্ত মাটি বৈদ্যনাথতলার আম বাগানে। জন্ম হয় মুজিবনগরের।

তারপর আওয়ামী লীগের চিপ হুইপ অধ্যাপক মো: ইউসুফ আলী বাংলার মুক্ত মাটিতে স্বাধীনতাকামী কয়েক হাজার জনতা ও শতাধিক দেশী বিদেশী সাংবাদিকের সম্মুখে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এরপর একে একে শপথগ্রহণ করেন মন্ত্রীপরিষদের উপস্থিত নেতাগণ।

রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের অনুপস্থিতিতে শপথবাক্য পাঠ করেন উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তাজউদ্দিন আহমেদের নাম ঘোষণা করা হয়। যুদ্ধকালীন প্রধান সেনাপতি করা হয় কর্ণেল এমএজি ওসমানীকে।
প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তাজউদ্দিন আহমেদ ৩০ মিনিট ব্যাপী সার্বিক বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে ভাষণ দেন। এবং ভাষণ শেষে ঘোষণা করেন Ñ আজ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী বৈদ্যনাথতলা এবং এর নতুন নাম হবে মুজিবনগর।

আর এই মুজিবগনর নাম নিয়েই চলছে নব্য বাংলাদেশের প্রশাসনব্যবস্থা, চলছে মুক্তিযুদ্ধ, এসেছে সাহায্য সহযোগিতা বৈদেশিক স্বীকৃতি। এবং শেষ পর্যন্ত মুজিবনগর সরকারের নামেই বিজয় অর্জিত হয়েছে। এ কথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অস্তিত্বই দাঁড়িয়ে আছে মুজিবনগরের ভিত্তির উপর।
মুজিবনগর দিবস ঐতিহাসিক বিচারে এক অনন্য দিন, অনিবার্য দিন।

এত তাৎপর্যপূর্ণ হয়েও আজও মুজিবনগর তার সার্বিক মর্যাদা ফিরে পায়নি। অবহেলা অনাদরে এক কর্ণারে পড়ে তাকে সারাবছর। বই পত্রেও ঠাঁই হয়নি সেভাবে।

যাহোক এরই মাঝে ১৯৮৭ সালে ১৭ই এপ্রিল প্রেসিডেন্ট এরশাদ মুজিবনগরে এসে উদ্বোধন করেন মুজিবনগর স্মৃতি সৌধ।
৩৮ একর জমির উপর ১৩০০টি বৃক্ষশোভিত ছায়াঢাকা পরিবেশে শিল্পী তানভীর কবীরের অমরর্কীতি মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ। ২৩টি ত্রিকোণ দেয়ালের সমন্বয়ে উদীয়মান সূর্যের প্রতিকৃতিকে পটভূমি করে নির্মিত এই স্মৃতিসৌধ। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত এই

২৩ বছর পাকিস্তানী শাসকদের নির্যাতনের প্রতীক এই ২৩টি স্তম্ভ। ৯টি সিঁড়ি বহন করে ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি।
স্মৃতিসৌধে আছে ৩টি বেদি। একটি বেদি দ্বারা স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের প্রতীকী প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে। ২য়টিতে অসংখ্য নুড়ি পাথর মুক্তিযুদ্ধকালীন বেদিটি শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের মঞ্চ ছিল।

বর্তমানে মুজিবনগরে গড়ে তোলা হয়েছে একটি হেলিপ্যাড মুজিবনগর কমপ্লেক্স, স্বাধীনতা ক্লাব, পাঠাগার, বনভোজনের রান্নার স্থান ইত্যাদি। কিন্তু নাগরিক জীবনের উন্নতির ছোঁয়া আজও সেভাবে লাগেনি। আজও আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ঐক্যমতেই পৌঁছাতে পারেনি কেউ।

তবে আশার কথা এই যে, প্রতিদিন অনেক মানুষ ইতিহাসের সাক্ষী আমবাগানের যে স্থানে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়েছে সেই স্থানের স্মৃতিসৌধটির সামনে বিন¤্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করে ৩০ লাখ শহীদদের। আজও কেউ মেহেরপুরে অতিথি হয়ে গেলে মুজিবনগরের দর্শন ছাড়া ফিরে আসে না। ইতিহাসের অমরত্ব লাভ করা মুজিবনগর তাই আমাদের অহংকার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here