মুন্সিগঞ্জে মুক্ত দিবসের স্মৃতিচারণ: স্মৃতিতে ১৯৭১-এর ১১ ডিসেম্বর

১লা অক্টোম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার, মুন্সিগঞ্জ নিউজ ডটকম:

দিপালী ভট্টাচার্য:

Untitled-4দিনটি ছিল পাক-হানাদার মুক্ত মুন্সিগঞ্জ ঠিক ঐ মুহুর্তে অনুভূতিটা কতটা মনে রাখতে পেরেছি জানিনা। তবে যতটা সম্ভব ব্যক্ত করতে চেষ্ঠা করেছি। শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত ছিল মুন্সিগঞ্জের সারা শহরটা।

এই সময় ঘর থেকে বের হয়ে অনেকেই আনন্দ মিছিল দেখছিল। কেউ কেউ আবার যোগও দিচ্ছিল আনন্দ-মিছিলে। বাগমাহমুদালি পাড়ার সুবাসদের বাড়ি থেকে আমিও বের হয়েছিলাম। কে একজন হাত বাড়িযে আমাকে টেনে নিল। কিন্তু আমার পা চলছিলনা। দুঃখে বুকটা ফেঁটে যাচ্ছিল। বাগমাহমুদালি পাড়ার প্রসন্ন ভবনের বারান্দায় গড়িয়ে পরে কেঁদেছিলাম।

মনে হচ্ছিল সবাই দৌড়ে চলে যাই কেওয়ার সেই চৌধুরী বাড়িতে। সেখান থেকে পাক-বাহিনী ১৯৭১ সালে আমার বাবা ও ভাইসহ ১৭ জনকে ধরে নিয়ে ১৫ আগষ্ট মহাকালীর সাতানিখিলের পূর্বপাড়ের খালের পাড়ে সারি বেধে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে মেরেছিল। সেখানে গিয়ে সবাইকে বলি ১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর মুন্সিগঞ্জ হানাদার মুক্ত আমরা যে যার বাড়িতে চলে যাই। “মুন্সিগঞ্জ হলো হানাদার মুক্ত আর বাবা ভাই হারিয়ে আমার জীবন হলো চির দুঃখ যুক্ত”। সেই থেকে দুঃখের সাগরে হাবডুবু খাচ্ছি। কুল কিনারা পাচ্ছিনা।

দিনটি হয়ে রইল আমার জীবনে স্মরনীয়। শুধু আমার জীবনের নয় গোটা মুন্সিগঞ্জবাসীর জন্যও স্মরনীয়। পাকবাহিনী মুন্সিগঞ্জ ঢুকে তছনছ করেছে শহরটাকে। পাক হানাদার বাহিনী বাবুলদের বাড়িতে আগুন দিল এরপর পান্না-ভিলায় আগুন দিল।

আমি তখন এ.ভি.জে.এম সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। স্কুলে গিয়ে মুখামুখি হয়ে পরি জঙ্গী পাক সেনা মেজর খালেদের। আমার নাম শুনে সে বলল “এ তো হিন্দুকা আওরাত হায়” বুঝতে পারলাম আমার সামনে খুব বিপদ।

হাতে কিছু নগদ টাকা ছিল, টাকা কটা প্রধান শিক্ষিকার মেয়ে হেনার হাতে দিলাম আর আমার মা এর ঠিকানা দিয়ে বললাম যদি আমার কিছু হয়ে যায় তাহলে এই ঠিকানায় টাকা কটা পাঠিয়ে দিতে।

আর এইদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিলাম মাথায় কাপড় ছিল না। কাচারীঘাট থেকে এক পাকসেনা আমাকে অনুসরণ করছিল। আমি হাটছিলাম আর কান খারা করে বুট জুতার আওয়াজ শুনছিলাম।

ভাবলাম হয়তো ওদের ক্যাম্পে যাবে। কিন্তু ক্যাম্প ছাড়িয়ে এলাম ভাবলাম হয়তো থানায় যাবে কিন্তু থানা পার হয়ে এলাম বুটের শব্দ ঠিকই হচ্ছে। তখন আমার মনে সন্দেহ হলো আমি বাড়ি না গিয়ে বাগমামুদালীপাড়ার মনু আপার বাসায় যাই।

সেখানে গিয়ে বসেও কাপছিলাম। মনু আপা আমাকে জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে তোর। আমার কথা শুনে মনু আপা বললেন ঠিক আছে কিছুক্ষন অপেক্ষা করে পরে যা। রাতেই সেই পাক সেনা ওখানে গিয়ে খোঁজ করেছে “হিন্দু আওরাত কাহা”।

এমনি করে বিভিন্ন সময়ে বিপদে পড়েছি। আবার ঈশ্বরের কৃপায় রক্ষাও পেয়েছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো এত কিছুর পরেও কেন্দ্রীয় শহীদ পরিবারের তালিকায় আমাদের নাম নেই। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১৬ ডিসেম্বর “বিজয় দিবস” ও ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবস শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় প্রতি বছর।

এছাড়া ১১ ডিসেম্বর হানাদার মুক্ত মুন্সিগঞ্জ নিয়ে মনে বিভিন্ন অনুভূতি জাগে। স্বাধীনতা যুদ্ধে বাবা ও ছোড়দার পবিত্র রক্ত দিতে পেরেছে গর্ব ও অনুভব করছি। নিজেকে ভাগ্যবতি মনে করছি।

লেখিকা : দিপালী ভট্টাচার্য, সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসার মাধ্যমিক (অবসর)।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here