লক ডাউনের বাইশ দিন

শরমিতা লায়লা প্রমি: করোনা ভাইরাসের উত্তাল মহামারিতে সারা বিশ্ববাসী যখন দিশেহারা, করোনা থেকে বাঁচতে বিশ্বের নামিদামি ডাক্তার, বিশেসজ্ঞরা নিত্য নতুন পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে, করোনা একটি নতুন রোগ যে রোগের কোন প্রতিসেধক নাই, নেই কোন ঔষধ, যে চিকিৎসা আছে তাহলো যদি শ্বাসকষ্ট হয় সেই ক্ষেত্রে কৃত্রিম অক্রিজেন দিয়ে রোগীর শ্বাস প্রশ্বাদ সচল রাখাই একমাত্র চিকিৎসা।

আমেরিকা, ইউরোপ আর উন্নত দেশগুলো বলা চলে করোনার কাছে পরাজয় শিকার করে ভগ্যের কাছে মেনে নিয়েছে, তারা করোনা ভাইরাসের ঔষধ আর প্রতিশেধক তৈরীতে মনোনিবেশ করেছে, ইতিমধ্যে এই সকল দেশের লক্ষ লক্ষ লোক করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে, আক্রান্তের সংখ্যাও কয়েক লক্ষ লোক।

এই করোনা ভাইরাসের করালগ্রাস থেকে আমাদের প্রিয় মাতৃভুমি বাংলাদেশও বাদ যায় নাই, অনেকে আক্রান্ত হচ্ছে এবং কিছু কিছু আক্রান্তকারী মারাও যাচ্ছে। এই করোনার আক্রমন থেকে আমাদের ছয় সদস্যেও পরিবারও রক্ষা পায় নাই। আমাদের পরিবারের  দুইজন করোনায় আক্রান্ত হয়, প্রথম আমার পরিবারের ছোট

সন্তান এবং সাতদিন পর বড় ছেলের স্ত্রী, ২২শে এপ্রিল যখন খবর পাই আমার ছোট সন্তান জুম্মান করোনায় আক্রান্ত তখনই আমরা নিজ গৃহে আইসোলেশনে চলে যাই, আমাদের বাড়ী প্রশাসনিকভাবে লক ডাউন করা হয়, প্রথম দিকে আমরা মানসিকভাবে ভেঙ্গে পরি,

 বিভিন্ন চিকিৎসক ও পরিচিতজনের সাথে যোগাযোগ করি, চিকিৎসকদের কাছ থেকে তেমন সহায়তা না পেলেও পরিচিত অনেকে শাহস যোগিয়েছে, বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছে, বাড়ী লক ডাউন করার পর প্রথমদিন দিন আমরা ছেলের শারিরিকভাবে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দেয়, তার মধ্যে অস্বস্থিকর লক্ষন পরিলক্ষিত হওয়ায় আমরা প্রথম তিনদিন নিদ্রাহীনভাবে ছেলের পাশে থেকেছি, তাকে মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখতে চেষ্টা করেছি,

ছেলে পাশের রুমে থাকতো আর বড় ছেলের স্ত্রী দ্বিতীয় তালায় একমাত্র নাতনী(৬)কে নিয়ে ছেলের সাথে থাকতো তাদেরও রিতিমত পরামর্শ ও শাহস যোগিয়েছি, ধীরে ধীরে তাদের শারিরিক অবস্থার কিছু উন্নত হওয়ায় আমরা কিছুটা চিন্তামুক্ত হয়ে তাদের সেবা করেছি, তবে আমাদের মনে করোনা ভীতি ছিলই, আমরা সকলে পাচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেছি,

ছেলে ও ছেলের মা নিয়মিত কোরয়ান শরীফ তালোয়াৎ করেছে, খাবার সময় একসাথে খেয়েছি, যদিও দুরত্ব বজায় রেখেছি, আমি সারারাত জেগে ছিলাম টেলিভিশন দেখেছি, সেহেরী খেয়ে ফজরের নামাজ পরে ঘুমিয়েছি, সকাল ১১ টার সময় ঘুম থেকে উঠে গোসল করে  জোহরের নামাজ পড়ে কিছু সময় টেলিভিশন  দেখেছি, আসরের নামাজ পরে টেলিভিশন দেখেছি  এবং একসাথে ইফতার করেছি, তবে আমার স্ত্রী জোহরের

নামাজ পরে রান্না ও ইফতার আয়োজনে ব্যাস্ত থাকতো, এশার আর তারাবী নামাজের পর খাওয়া দাওয়া করে আমরা টেলিভিশনে কিছু অনুষ্ঠান দেখে সময় কাটিয়েছি, তারা ১০/১১ টার মধ্যে ঘুমিয়ে পরতো আর আমি

রাতজাগা পাখীর মতো টেলিভিশনের বিভিন্ন চ্যানেলে বিচরন করে সেহরীর সময় পর্যন্ত সময় পার করেছি, সেহেরীর সময় সবাইকে ঘুম থেকে জাগিয়ে একসাথে সেহেরী খেয়ে ফজরের নামাজ পরে পরের দিনের অপেক্ষায় ঘুমিয়ে পরেছি।

তবে বাংলাদেশের বিভিন্ন চ্যানেলে টক-সু এবং করোনা নিয়ে রাজনীতি আমাদের ব্যথিত করেছি, অনেকের মিথ্যাচার আমাদের সহ্য  করতে হয়েছে, অনেক ডাক্তারের করোনা নিয়ে অতি উৎসায়ী বক্তব্য মেনে নিতে কষ্ট হয়েছে, বিশেষ করে এই করোনা ভীতির সময় ডাক্তারদের দুইভাগে বিভক্ত, দুই ধরনের বক্তব্যে, আমরা

বিব্রতবোধ করেছি, অনেক ক্ষেত্রে আমরা ভয় পেয়েছি, তাদের প্রতি অনেক ক্ষেত্রে মনে ঘৃনার জম্ম নিত।মনে হয়েছে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে সমগ্র বাঙালী জাতি একসাথে লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছি, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে একাত্তরের রনাঙ্গনের যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করার কখনও কোন চিন্তা মাথায় আসেনি

যদিও সেই সময় আমরা শুধুমাত্র ৩০৩ লাইফেল আর গ্রেনেড নিয়ে পাক হানাদারদেও সাথে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিলাম মৃত্যুভযে ভীত ছিলাম না অথচ ডাক্তারদের কিছু আচরন মেনে নিতে কষ্ট হয়েছে, তাদের একেক সময় একেক ধরনের  বক্তব্য আমাদের  মানসিক সমস্যার সৃষ্টি করে,  তারা করোনা ভয়ে  চিকিৎসা থেকে

অনেক ডাক্তার নিজ ইচ্ছায় হোম কোয়াইনটানে চলে যায়।তবে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আমাদেরই মাঝে কিছু অমানুষ, পাষণ্ড পাকহানাদার বাহিনীকে সহযোগিতা করেছিল, ছিল হানাদারবাহিনীর সহযোদ্ধা তাদের মধ্যে জামাতে ইসলাম, মুসলিমলীগ, আল বদর, নেজামে ইসলাম,তাদের সহযোগী বাহিনী শিবির, বদর বাহিনী, শান্তি

কমিটি। আর স্বাধীনতার ৫০ বছরের মধ্যে ২০২০ সনে এই সকল বাহীনীর সাথে যুক্ত হয় ১৯৭৫ সনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু, তার পরিবারের সদস্য ও জাতীয চার নেতার হত্যাকারী চক্র, এই চক্ররা কখনো বাংলাদেশের ভাল চান না, চান না বাংলাদেশের মানুষের মঙ্গল, তাইতো এই দেশে কোন বিপদ আসলে সেই বিপদকে উস্কে দিয়ে

ফায়দা হাসিল করতে তৎপর হয়ে উঠে , এই অমানুষ জানোয়াররা বাংলাদেশের মিডিয়া, রাজনীতি, চিকিৎসা, প্রশাসন, সকল বাহিনীর মধ্যেই বিচরন করছে, তাই আমি মনে করি  এই অপশক্তিকে মোকাবেলা করে শাহস

শক্তি আর বিচক্ষনতার সাথে করোনাকে প্রতিরোধ করে আমাদেরকে জয়ী হতে হবে, যেমন ভাবে বাইশ দিনে আমরা করোনাকে জয় করতে পেরেছি। লেখক: বীরমুক্তিযোদ্ধা কামাল উদ্দিন আহাম্মেদ, সম্পাদক, চেতনায় একাত্তর

Attachments area

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here