ফলো আপ: ঢালীকান্দি গ্রামের মানুষের ভরসা বাঁশের সাঁকো

photo-shako-3মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাকান্দি ইউনিয়নের ঢালীকান্দিসহ একাধিক গ্রামের মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা হচ্ছে এই বাঁশের সাঁকো। এ বাঁশের সাঁকো দিয়ে এ পথে একাধিক গ্রামের মানুষ প্রতিদিন যাতায়াত করে থাকে বলে এখানকার অধিবাসীরা এ প্রতিবেদককে জানিয়েছে।

এখানে সরকারিভাবে দুটি গুচ্ছ গ্রাম বা আদর্শ গ্রাম থাকা সত্বেও এখানে পাকা রাস্তা ও পাকা সেতুসহ কোন ধরণের উন্নয়নের ছোঁয়া আজও লাগেনি বলে গ্রামবাসী অভিযোগ করেছেন। রজত রেখা নদীকে কেন্দ্র করে এখানে ভৌগলিকভাবে উপজেলার সীমান্ত দুটিভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। রজত রেখা নদীর পূর্ব পাড়ে রয়েছে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা। আর পশ্চিম পাড়ে রয়েছে টঙ্গীবাড়ী উপজেলা।

এখানকার গ্রামবাসীদের শিক্ষাক্ষেত্রে স্কুল কলেজ, বড় ধরণের বিয়ে সাদিসহ নিত্য দিনের বাজার সদাই কেনা কাটা করতে ছুটতে হয় এ বাঁশের সাঁকো দিয়ে টঙ্গীবাড়ী উপজেলার আলদী বাজার, পুরা বাজার ও দীঘিরপাড় বাজারের দিকে। বড় ধরণের অসুখ বিসুখের সময় এ গ্রামবাসীদের এ পথেই ছুটে যেতে হয় চিকিৎসার জন্য।

রজত রেখার নদীর ওপরে বাঁশের সাঁকোর পশ্চিম পাড়ের অংশের সবটুকু মাটির কাঁচা রাস্তাটি পড়েছে টঙ্গীবাড়ী উপজেলার যশলং ইউনিয়নের অংশ হিসেবে। যে কোন নির্বাচনে ভোটা ভোটাটির সময় এক্ষেত্রে পূর্ব পাড়ের মানুষেরা এখানে কোন কাজে লাগে না জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে। এছাড়া এ পথের কাঁচা রাস্তার দু’ধারে এখনো ব্যাপক হারে বসতি গড়ে উঠেনি।

যারা এ পথ ব্যবহার করছেন তারা হচ্ছে অন্য উপজেলার মানুষেরা। যার কারণে তাদের হয়ে এখানে এ ধরণের সমস্যার কথা বলার কেউ না থাকায় এখানে বাঁশের সাঁকোর পরিবর্তে পাকা সেতু ও মাটির কাঁচা রাস্তার পরিবর্তে পাকা রাস্তা নিমার্ণের কথা বলার জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।

যার কারণে স্বাধীনতার এতো বছরেও এখানে কোন ধরণের উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি এ জনপদে। এক্ষেত্রে গ্রামবাসীদের অভিযোগ হচ্ছে যে, এখানকার উন্নয়নে দুই উপজেলার ভৌগলিক সীমান্তের কারণেও এখানকার উন্নয়ন থমকে আছে বলে তারা মনে করছেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার অনেক বছর অতিবাহিত হলেও এখানে কোন ধরণের উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি আজোও। এ নিয়ে এলাকাবাসীর ক্ষোভ এখন উপচে পড়েছে। তাদের দাবি হচ্ছে বাঁশের সাঁকোটি যেন পাকা সেতুতে রূপ নেয়। আর কাঁচা রাস্তাটি যেন পাকা রাস্তায় উন্নিত হয়।

রজত রেখা নদীরপাড়ের ঢালীকান্দি গ্রামকে কেন্দ্র করে এখানে একাধিক গ্রামের বসতি গড়ে উঠেছে। এখানে ছোট ছোট অনেক গুলো গ্রাম রয়েছে রজত রেখা নদীকে কেন্দ্র করে। এ গ্রাম গুলোতে রয়েছে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য দ্রব্যের জন্য ছোট ছোট অনেক গুলো দোকানপার্ট। এসব দোকাপার্টে মুদি মালামাল আনা নেয়ার জন্য কোন সড়ক পথ নেই। তাদেরকে নির্ভর করতে হয় রজত রেখার নদীর ওপর নৌকার জন্য।

আলদি থেকে পাইকারি মালামাল কিনে নৌকা করে এখানকার গ্রামে গ্রামে সেগুলো নিয়ে আসা হয়ে থাকে বলে এখানকার দোকানিরা জানিয়েছে। অনেক গুলো গ্রামে যাতায়াতের জন্য এখানে রয়েছে পায়ে হাটা সরু রাস্তা। এখানকার রাস্তা গুলো কিছু কিছু স্থানে এতো সরু যে একজনের বেশি দুইজন কোনভাবেই হাট চলা করতে পারে না। এর মধ্যে দিয়ে এখানে চলছে এ গ্রামের মানুষের নিত্য দিনের বসবাস।

এছাড়া এগ্রাম থেকে ওগ্রামে মানুষ কোন রকমে প্রতিদিনই এখানে এ সরু পথ দিয়ে যাতায়াত করছে। একাধিক গ্রামের মানুষ মোল্লাকান্দি ইউনিয়ন পরিষদে যাওয়ার সময় অনেকেই ঘুর পথে না যেয়ে, কেউ কেউ পায়ে হেটে এ ঢালীকান্দি গ্রামের ওপর দিয়ে সহজেই চলে যায় বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।

এখানে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এছাড়া পুরা হাই স্কুলের অবসর প্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল হাই মাস্টার তার নিজ বাড়িতে এ গ্রামে একটি স্কুল গড়ে তুলেছেন। সেখানে অনেকেই পড়ালেখা করে শিক্ষা গ্রহণ করছেন। এছাড়া আবার অনেকেই আরো ভালো মানের পড়া লেখার জন্য এখান থেকে পায়ে হেটে সেরজাবাদের রানা শফিউল্লাহ কলেজে, পুরা উচ্চ বিদ্যালয় ও মাকহাটি উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে পড়ালেখা করছেন বলে একাধিক সূত্র মতে জানা গেছে।

অন্যদিকে রজতরেখা নদীতে শীত মৌসুমে পানি কমে গেলে এখানকার শিক্ষার্থীরা শর্টকার্ট হিসেবে ডিঙ্গি নৌকা দিয়ে নদীপাড় হয়ে ক্ষেতের আইলে ধরে অনেকে পড়তে যান বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্টানে।

নদী বেষ্টিত এ গ্রামে সরকারিভাবে দুটি গুচ্ছ গ্রাম বা আদর্শ গ্রাম গড়ে উঠেছে। এর ফলে এ গ্রামটি ইতোমধ্যে জনবহুল গ্রামে পরিণত হয়েছে। কিন্তু উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি তেমনটি।

গ্রামের ভেতর দিয়ে মানুষে চলাচলের জন্য সরু রাস্তা ও লিংক রোড গুলো তেমনটা চওড়া হয়নি। এর ফলে এখানে রিক্সা বা মিশুকের মতো কোন ধরণের যানবাহন চলাচল করছে না। এখানকার গ্রাম্য রাস্তা গুলো চওড়াা হলে বিভিন্ন যানবাহন চলাচল বৃদ্ধি পেলে আর্থ সামাজিকভাবে এখানকার গ্রামবাসিরা নানাভাবে উপকৃত হতে পারতো বলে এখানকার মানুষেরা মনে করছেন।

এখানে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি না হওয়ায় এখানকার মানুষ বেশির ভাগ সময় অলস জীবন যাপন করে থাকেন বলেও শোনা যাচ্ছে। এ কারণে এখান অনেকে মানুষ নানাভাবে অপরাধ জগতের সাথে মিশে যাচ্ছে নানা উপায়ে। এমনটির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে গ্রামবাসীদেও পক্ষ থেকে।

রজত রেখা নদী দ্বারা বেষ্টিত এ গ্রাম গুলোর একাধিক সরু রাস্তা দিয়ে চলাচলে একজন মানুষের চলাই বর্তমানে দু:স্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই রাস্তা গুলো কবে প্রশস্তায় পাকা হবে তা নিয়ে এখানকার মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম যুগের পর যুগ পার করে দিচ্ছেন। এখানকার বসতি মানুষেরা এ স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে এখানে বেঁচে দিন যাপন করছেন। রজত রেখা নদীর কুল ঘেসে ২০০৩ সালে মোল্লাকান্দি ইউনিয়নে গাবুয়া গ্রামের মোল্লাবাড়িতে ৫০ জনের পরিবারকে নিয়ে এখানে গড়ে উঠে গ্রাম্য ভাষায় গুচ্ছ গ্রাম।

তবে সরকারি ভাবে এর নাম দেয়া হয়েছে মোল্লাবাড়ি আদর্শ গ্রাম। অন্যদিকে এর কিছু দূরেই নতুন করে গাবুয়া গ্রামেই ২০১৮ সালে ৩৫ জন পরিবারেকে নিয়ে আবারো এখানেই আরো একটি গুচ্ছ গ্রাম আলোর মুখ দেখে। এখানে হত দরিদ্র ও ভূমিহীনদের ঠাঁই হয়েছে। সরকারিভাবে এখানে গুচ্ছ গ্রাম গড়ে উঠলেও এখানে সেইভাবে যাতায়াতের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি আজোও।

রজত রেখা নদীর ওপর দিয়ে বিশাল আকারে যে সাঁকো রয়েছে তা এখানকার অধিবাসীদের নিজেদের তোলা টাকায় এই সাঁকো নির্মিত হয়েছে বলে এখানকার লোকজনেরা দাবি করেছেন। এ সাঁকোর পশ্চিম দিকের একটি কাঁচা মাটির রাস্তা কয়েকজনের জমির ওপর দিয়ে টঙ্গীবাড়ী উপজেলার যশলং ইউনিয়নের সেরজাবাদ এলাকার মাঝামাঝিতে গিয়ে মিশেছে। এই কাঁচা মাটির রাস্তায় এখানে বেশ কয়েকটি জমি রয়েছে।

এলাকাবাসীর যাতায়াতের সুবিধায় এখানকার মানুষ তাদের জমির ওপর দিয়ে কয়েক মাইলের কাঁচা মাটির রাস্তা তৈরি করে এই পথেই হাটা চলা করেছেন। সাঁকো পাড় হয়ে এই কাঁচা মাটির রাস্তা দিয়ে পায়ে হেটে খুব সহজেই গ্রামবাসীরা সড়ক পথের মুল রাস্তায় এসে গাড়ী যোগে আলদী বাজার, পুরা বাজার ও দীঘিরপাড়ে বর্তমানে যাতায়াত করতে পারছেন খুবই সহজে।

তবে মাটির কাঁচা রাস্তাটি সীমান্ত এলাকা পড়েছে টঙ্গীবাড়ী উপজেলার মধ্যে। এ রাস্তাটি পাকা হলে এ পথের মানুষের অনেকটাই উপকার হতো বলে অনেকেই মনে করছেন। তাছাড়া বাঁশের সাঁকোটি পাকা সেতু হলেও এখানকার মানুষরা ভোগান্তি থেকে রেহাই পেতো বলে অনেকেই মনে করছেন।

এখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন না হওয়ায় এখানে অসামাজিক কার্যকলাপ অনেকেটাই বেড়ে গেছে বলে এখানকার অধিবাসীরা দাবি করছেন। পায়ে হাটা পথ থাকায় এখানে বহিরাগত একাধিক গ্রামের মানুষের আনাগোনা বিকেলের পর থেকে বেড়ে যায়।

অনেক রাত অব্দি এখানে অসামাজিক কাজ কর্ম চলে বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন। দুই উপজেলার সীমান্ত এলাকা হওয়া এর সুযোগ ও সুবিধা নিচ্ছে অপরাধ চক্রের সাথে জড়িত সিন্ডিকেটরা। এছাড়া এলাকাটি দুর্গম হওয়ায় এখানে খুব একটা আইন শৃংখলা বাহিনীর কেউ আসে না বলে এখানকার গ্রামবাসীরা জানিয়েছে।

যোগাযোগ ব্যবস্থা এ রকম থাকায় অপরাধীরা সুযোগ বুঝে অন্য এলাকায় অপরাধ করে এখানে এসে অনেকেই গা ঢাকা দেয় বলে অভিযোগ উঠেছে এ গ্রাম থেকে। মোল্লাকান্দি ইউপি চেয়ারম্যান মহসিনা হক কল্পনা বলেন, গ্রামগুলো দুই উপজেলার সীমান্তবর্তী হওয়ার কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থার এখানে তেমন উন্নয়ন হয়নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here