ফলিক এসিড গ্রহণের সচেতনতাই কমাতে পারে শিশুর জন্ম ত্রুটি!

123311071_1536697609872959_6361490071620617135_nফলিক এসিড ভিটামিন বি পরিবারের একটি সদস্য। এটি ভিটামিন বি-৯ বা, ফলেট নামেও পরিচিত। ফলিক এসিড পানিতে দ্রবনীয় বলে এ ভিটামিন চর্বিতে দ্রবনীয় ভিটামিনের মত শরীরে মজুত থাকে না। তাই এই ভিটামিনের চাহিদা পূরনে কৃত্রিম উপায়ে উৎপাদিত ফলিক এসিড গ্রহণ করতে হয়।

এই ভিটামিনের অভাবে শিশু নানাবিধ জন্ম ত্রুটি নিয়ে জন্ম নিতে পারে। সি.ডি.সি (এর তথ্যমতে প্রতি ৪.৩০ (সাড়ে চার) মিনিটে একজন শিশু জন্ম ত্রুটি নিয়ে জন্ম নেয়। এ হিসাব মোতাবেক প্রতি ৩৩ জনে একজন এবং প্রতি বছরে প্রায় ১২০০০০ ( এক লক্ষ বিশ হাজার) শিশু জন্ম ত্রুটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেয়। আমাদের

দেশে (বাংলাদেশে) বঙ্গবন্ধু শেখ মজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত গবেষণা দলের তথ্যমতে প্রতি বছর প্রায় ৯.৮ শতাংশ বা, প্রতি ১০০ জনে ৩-৬ জন শিশু জন্ম ত্রুটি নিয়ে জন্ম নেয়। এই ডাটা গুলোর দিকে তাকালেই জন্ম ত্রুটির ভয়াবহতা অনুমান করা যায়।

শিশুর নানাবিধ জন্ম ত্রুটির মধ্যে নিউরাল টিউব ডিফেক্ট অন্যতম যা মূলত মস্তিষ্ক এবং মেরুদন্ডের সমস্যা। নিউরাল টিউব হল একটি মাস্কুলার নল। যার উপরে অংশ মস্তিষ্ক ও মাথার খুলি এবং নিচের অংশ মেরুদণ্ড গঠনে সহয়তা করে।

মাথার খুলি বা, মস্তিষ্কের গঠনগত সমস্যাকে এ্যানসেফালি রোগ বলা হয়। এ্যানসেফালি রোগ নিয়ে জন্মানো শিশুর মাথার খুলির বা, মস্তিষ্কের অংশিক বা, সম্পূর্ণ না ও হতে পারে। অর্থাৎ খুলিবিহীন বা, মস্তিষ্কবিহীন শিশু জন্ম নেয়া। ফলিক এসিডের অভাবে শরীরে দুবর্লতা, ধূসর বর্ণের চুল, মুখের আলসার এবং জিহ্বায় ফোলাভাব দেখা যেতে পারে।

মুখ এবং জিহ্বায় আলসার যদি ফলিক এসিডের অভাবের কারণে হয় তবে সে ক্ষেত্রে ফলিক এসিড প্রদান না করলে কোনোভাবেই মুখের আলসার ভালো হবে না। আমাদের দেশে মুখে বা জিহ্বায় আলসার হলে মুখস্থ রিবোফ্লাভিন ট্যাবলেট খেতে দেয়া হয়। এ কথা সত্য যে রিবোফ্লাবিন বা ভিটামিন বি ২ মুখের ক্ষত সারাতে সাহায্য করে কিন্তু মুখের আলসার যদি ফলিক এসিডের অভাবের কারণ হয় তবে সে ক্ষেত্রে রিবোফ্লাভিন বা, ভিটামিন বি ২ রোগীকে খেতে দিলে মুখ বা জিহ্বার আলসার ভালো হবে না।

এছাড়া হাত, পা, চোখ ও হার্টের জন্ম ত্রুটি নিয়ে শিশু জন্ম নিতে পারে। আমাদের অনাগত শিশুকে এ ভয়ানক পরিনতি থেকে রক্ষা করতে, আজ থেকে আমাদের ফলিক এসিড গ্রহণে সচেতন হতে হবে এবং করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান সি.ডি.সি এর তথ্যসূত্রে সে দেশের নারীদের নিয়মিত ৪০০০ মিলিমাইক্রোগ্রাম ফলিক এসিড গ্রহণে উৎসাহিত করা হয়।

একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য এবং ওষুধ প্রসাশন বিভিন্ন পুষ্টি খাদ্যের সাথে ফলিক এসিড বাধ্যতামূলক করেছে। আমাদের দেশে ফলিক এসিডের চাহিদা পূরণের লক্ষে বিভিন্ন ওষুধ কম্পানিকে সরকার কৃত্রিম ফলিক এসিড বাজারজাত করণের অনুমোদন দিয়েছেন।

এই কম্পানি গুলো ফলিক এসিড ৫ মিলি গ্রামের ট্যাবলেট আকারে বাজারজাত করছে। আমাদের ডাক্তারগন গর্ভধারনের আগে এবং গর্ভধারনের ৩ মাস সময় পর্যন্ত ৫ মিলি গ্রামের একটি করে ট্যাবলেট গ্রহণে পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

রোগীর অবস্থার উপর ভিত্তি করে মাত্রা বৃদ্ধিও করা হয়। একটি প্রশ্ন আমাদের মনে আসতেই পারে। প্রশ্নটি হল কৃত্রিম ফলিক এসিড গ্রহণ না করে খাদ্য থেকে আমরা এর চাহিদা পূরণ করতে পারি না? প্রশ্নটি করা স্বাভাবিক কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও কথাটি সত্য, আমাদের শরীর প্রাকৃতিক ভাবে প্রাপ্ত ফলিক এসিডের তুলনায় কৃত্রিম ভাবে উৎপাদিত ফলিক এসিড বেশি শোষন করে।

তাই ডাক্তারের পরামর্শে কৃত্রিম ফলিক এসিড গ্রহণ করাই উত্তম। প্রায় সকল ধরনের খাদ্য শস্যেই ফলিক এসিড থাকে। যেমন পুঁইশাক, পাটশাক, মুলাশাক, সরিষা শাক, পেঁপে, লেবু, ব্রকলি (ব্রুকলি দেখতে অনেকটা ফুল কপির মত),মটরশুঁটি, শিম, বরবটি, বাঁধাকপি, গাজর ইত্যাদি। আম, জাম, লিচু, কমলা, আঙ্গুর, স্ট্রবেরি ইত্যাদি। বিভিন্ন ধরণের ডাল যেমন মসুর, মুগ, মাষকালাই,

বুটের ডাল ইত্যাদিতে ফলিক এসিড প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান থাকে। এছাড়াও রয়েছে সরিষা, তিল, তিসি, সূর্যমুখীর বীজ, লাল চাল, লাল আটা ইত্যাদি। শাক-সবজি ধোয়া এবং রান্না করার সময় অধিকাংশ ফলিক এসিড বের হয়ে যায় বা, নষ্ট হয়ে যায়।

যার ফলে ফলিক এসিডের চাহিদা প্রাকৃতিক ভাবে আমরা পূরন করতে পারি না। যে মা বা, নারীর ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি অথবা, ইতিপূর্বে এ্যানসেফালি শিশুর জন্ম দিয়েছে, সে সকল মা বা,নারী চিকিৎসকের পরামর্শে বেশি মাত্রা ফলিক এসিড গ্রহণ করবেন।

লেখক:
ডা: মো: আল রাব্বনী
ডি.এম.এফ(ঢাকা)
বি.এম.ডি.সি রেজি নং ডি- ৮৭১৭
ডিপ্লোমা চিকিৎসক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here