আমার দেখা একাত্তরের ৭ই মার্চের ভাষণ

7 march 71বাঙালি জাতিকে সু-সংগঠিত করা, বাঙালি জাতিকে মুক্তির চেতনায় উদ্ভাসিত করা, মনে মুক্তির জাগরণ সৃষ্টি করা, দেশ মাতৃকার জন্য ত্যাগ স্বীকার করার সিদ্ধান্ত গ্রহণসহ সবকিছুই নিহিত আছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে

(রমনা রেসকোর্স ময়দানে) হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অলিখিত ৭ই মার্চের সেই ঐতিহাসিক বিশ্ব সেরা ভাষণের মধ্যে।

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের কয়েকদিন পূর্ব থেকেই আমদের প্রস্ততি ছিল বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ সরাসরি উপস্থিত থেকে শোনায় জন্য। ইতিপূর্বে বঙ্গবন্ধুর অনেক ভাষণ আমরা পল্টন ময়দানে উপস্থিত থেকে

শুনেছি তাই আন্দোলনের এই চরম সময় কিছুতেই আমরা ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণ মিস করতে চাই নাই।

তাই ৭ই মার্চ সকাল সকাল নাস্তা শেষ করে সেই সময়ের আমার একান্ত সাথী কুতুব উদ্দিন, সালাউদ্দিন মুন্সীসহ কাটপট্টি লঞ্চঘাট থেকে ঢাকা সদর ঘাটের উদ্দ্যেশে লঞ্চে চড়ে বসলাম। সকাল ১১.৩০মি: এর সময় লঞ্চটি ঢাকার সদরঘাটে ভিড়লে আমরা লঞ্চ থেকে নেমে রাস্তায় নেমে আসি। রাস্তায় লোকজনের প্রচণ্ড ভিড়। সবাই

রমনা রেসকোর্স ময়দানের উদ্দ্যেশে ছুটছে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে। অধিকাংশ লোকজন বরিশাল, ফরিদপুর আর ভোলা-পটুয়াখালী এলাকা থেকে এখানে আসে। রাস্তায় বাস ও রিক্সা নেই বললেই চলে। তাই আমরা রেসকোর্স ময়দানের উদ্দ্যেশে লোকজনের সাথে হেঁটে হেঁটেই চললাম।

আমরা তিনজন সবে মাত্র কিশোর পেরিয়ে যৌবনে পা-দিয়েছি। সেই সময়ে কুতুব আর আমি কলেজের আই.কম এর দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। সালাউদ্দিন মুন্সী সমবয়সী হলেও লেখাপড়ায় আমাদের চেয়ে এক বছরের জুনিয়র ছিলো।

তাই মনে মনে সভাস্থলে পৌঁছার একটা তাড়া ছিল। প্রায় দুপুর ১টা বাজে। রাস্তার মধ্যেই আমাদের এলাকার আরও ২/৩ জনের সাথে দেখা হল। তার মধ্যে একজন কবি, লেখক ও জাতীয় পুরুস্কার প্রাপ্ত গীতিকার হাসান ফকরী।

হাসান ফকরী আর আমরা স্কুল জীবন থেকে একই শ্রেণিতে লেখাপড়া করেছি। কলেজ জীবনে হাসান ফকরী আর্টস বিভাগের ছাত্র। কুতুব আর আমি কমার্স বিভাগের ছাত্র।

এর মধ্যে আমাদের দলে নিজ এলাকার প্রায় ১০/১২ জন হয়ে গেল। সবাই দ্রুত ছুটছি জনসভা স্থলের উদ্দ্যেশে। মাঝে মধ্যে রাস্তা থেকে কিছু না কিছু কিনে খাচ্ছি আর হাঁটছি। এইটা এক অন্যরকম অনুভূতি কাজ করছে মনের মাঝে। পশ্চিম পাকিস্তানীদের (ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারের) সাথে আলোচনা সফল না হওয়া। পাকি হানাদার সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে সারা দেশব্যাপী ক্ষোভ প্রচণ্ড আকার ধারণ করছে।

৭০’এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে জয়ী আওয়ামী লীগ এর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে বিলম্ব করা। পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর নানা ধরণের ছলচাতুরীপনার কারণে বাঙালিরা চরম উত্তেজনা-উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিল। তাই সবাই ছুটছে আজকের জনসভায় বঙ্গবন্ধুর চূড়ান্ত দিক নির্দেশনা জানার উদ্দ্যেশে। তাই বাঙালিদের কাছে এই জনসভার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।

জনসভাস্থলে পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় আড়াইটা বেজে গেল। জনসভাস্থল লোকে লোকারণ্য তিল ধরার জায়গা নেই। সভার পিছনে তিন দিকে প্রায় ৬ থেকে ৮ হাত লম্বা লম্বা গাছ। আমি অন্যান্যদের সাথে একটা গাছে উঠে পড়ি।

অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর বঙ্গবন্ধুর আসার খবর পেয়ে উপস্থিত লোকজনদের মাঝে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। জয় বাংলা-জয় বঙ্গবন্ধু। আমার নেতা, তোমার নেতা, শেখ মুজিব, শেখ মুজিব। শ্লোগানে স্লোগানে লোকজন উত্তেজনায় ফেটে পড়ে।

উপস্থিত এমন কোন লোক ছিল না যিনি শ্লোগান থেকে বিরত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু কিছু নেতা দের নিয়ে তাদের মধ্যে অন্যতম আব্দুর রাজ্জাক, মনি ভাই, তোফায়েল আহাম্মেদ। বঙ্গবন্ধু মঞ্চে উঠেই সরাসরি ডায়াসে মাইকের সামনে এসে দাঁড়ালেন।

জনতার উদ্দ্যেশে হাত নাড়লেন, শুরু করলেন সে অমর ইতিহাসময় সেরা ভাষণ, ভাষণের মাঝে মাঝেই জনতা জয় বাংলা শ্লোগানে, হাত তালি দিয়ে প্রচণ্ডভাবে ফেটে পড়ছে। বঙ্গবন্ধু হাত নেড়ে জনতাকে থামান, আবার ভাষণ দেন। বঙ্গবন্ধু যখন বললেন‘ এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, বঙ্গবন্ধুর পিছনে থাকা লোকটা হাততালি দিচ্ছে।

আবার যখন বললেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’ পিছনে থাকা লোকটা এবারও হাত তালি দিচ্ছে। বঙ্গবন্ধু আবার বললেন তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক, বঙ্গবন্ধুর পিছনের লোকটা এবার মুহ মুহ তালি দিচ্ছে।

বঙ্গবন্ধুর পিছনে থাকা সুঠাম দেহী লোকটার বিষয় জানার আগ্রহ দেখে হাসান ফকরী আমাকে বলল, ওনি আমাদের মুন্সীগঞ্জের মহিউদ্দিন। বঙ্গবন্ধুর বডি গার্ড। বঙ্গবন্ধুর পিছনে থাকা লোকটা আমাদের মুন্সীগঞ্জের মহিউদ্দিন। জেনে মনে মনে আনন্দ ও গর্ববোধ করলাম।

এরপর যখনই বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের কথা আসতো তখনই সেই সুঠাম দেহি বঙ্গবন্ধুর বডি গার্ড মহিউদ্দিন এর হাততালির দৃশ্য চোখে ভেসে উঠতো।

যাই হোক সভাশেষে আমরা সদরঘাট লঞ্চ ধরার উদ্দ্যেশে বাড়ি ফেরার লক্ষ্যে রওয়ানা হলাম। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত সংগ্রাম পরিষদ গঠন করার দৃপ্ত চেতনা নিয়ে। পাকহানাদার সামরিক সশাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রত্যয় নিয়ে। জয় বাংলা-জয় বঙ্গবন্ধু।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল উদ্দিন আহাম্মেদ, সম্পাদক, চেতনায় একাত্তর, সাংগঠনিক সম্পাদক, মুন্সীগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here