মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিমে পাঠান আমলের টেঙ্গর শাহী মসজিদ

মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিমে পাঠান আমলের টেঙ্গর শাহী মসজিদমোহাম্মদ সেলিম:

প্রাচীন বিক্রমপুরের হাজারো ঐতিহ্য আর অসংখ্য স্থাপনার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পাঠান আমলের টেঙ্গর শাহী মসজিদ। মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার মিরকাদিম পৌরসভার টেঙ্গর গ্রামে টেঙ্গর শাহী মসজিদটি ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে আজো দাাঁড়িয়ে আছে। টেঙ্গর গ্রামের নাম অনুসারে টেঙ্গর শাহী মসজিদটির নামকরণ করা হয়েছে বলে গ্রামবাসী মনে করেন।

১৫৬৯ সালে পাঠান সুলতান কররানীর শাসন আমলে মালেক আব্দুল্লাহ নামক একজন কাজী টেঙ্গর শাহী মসজিদটি নির্মাণ করেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। তবে টেঙ্গর মসজিদ কমিটি দাবি করছেন এটি নির্মাণ করেছেন বাদশাহ নাসির উদ্দিন মাহমুদ।

সেখানে বাংলা সালের নির্মাণ কাল দেখানো হচ্ছে ৮৭৫। এটি প্রথম দিকে ১৩৮৪ সালে সংস্কার হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এ ধরণের নাম ফলক টেঙ্গর মসজিদ কমিটি বর্তমানে সংরক্ষণ করছেন বলে দাবি উঠেছে। বিক্রমপুরে পাল বংশের শাসনামলে বিক্রমপুর থেকে হিন্দু ধর্ম ধীওে ধীওে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

এরপর বিক্রমপুরে রাষ্ট্র ধর্ম বৌদ্ধ মত প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে পাল বংশ পতনের সঙ্গে সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মের নাম নিশানা বিক্রমপুর থেকে আবারো মুছে যায়। পাল বংশের পতনের পর বিক্রমপুরে সেন রাজ বংশের আবির্ভাব ঘটে। ‘আইন-ই আকবরী’ বইয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। বিক্রমপুরে সেন বংশের শেষ রাজা ছিলেন বল্লাল সেন।

তার রাজধানী ছিল রামপালে। কোনো এক কিংবদন্তি ঘটনার মধ্য দিয়ে হিন্দু রাজত্বের অবসান ঘটে বিক্রমপুরে। তারপরে মুসলিম রাজত্বের আবির্ভাব ঘটে বিক্রমপুরে। সেন বংশের অবসানের পর মূলত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সামন্ত ভূ-স্বামী ও জমিদাররাই শাসন করতে থাকে বিক্রমপুরকে।

এক সময়ে বিক্রমপুরে শাসনে আসে পাঠান বংশের রাজারা। আর সেই সময়ে টেঙ্গর গ্রামে নির্মাণ হয় এই শাহী মসজিদটি। কালের আবর্তে বিক্রমপুরে পাঠান রাজত্বের অবসান ঘটে। এদিকে বার ভুইয়া, চাঁদ রায়, কেদার রায়ের পরাজয়ের পর বিক্রমপুরে মুঘল রাজত্বের সূচনা হয়।

তখন পুরো বিক্রমপুরটি একটি পরগনায় পরিণত হয়। বর্তমানে এটি মুন্সীগঞ্জ জেলা হিসেবে পরিচিত লাভ করেছে। বিক্রমপুরের প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায়, মিরকাদিমের টেঙ্গর গ্রামে পাঠান আমলে নির্মিত এ টেঙ্গর শাহী মসজিদটি অবস্থিত। এ মসজিদটির দৈর্ঘ্য হচ্ছে ৩৬ ফুট। আর প্রস্থ্য হচ্ছে ৩৪ ফুট।

মসজিদের পূর্বে চারটি, পশ্চিমে চারটি এবং উত্তর ও দক্ষিণে দুটি করে মোট ১২টি খিলানের ওপর এই মসজিদটি নির্মিত হয়।

মসজিদের দেয়াল ৫ ফুট পুরু। চতুর্দিকে বেষ্টিত একটি মজবুত স্থাপনা রয়েছে মসজিদটিতে। মসজিদের প্রতিটি বাহু ৩১ ফুট।

এক গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদের মূল আকর্ষণ। আর এ গম্বুজেই মসজিদের সুন্দর্য আরো ফুটে উঠেছে। গম্বুজের উপরে গোলার্ধে ও নিচের অংশে চিনামাটির মধ্যযুগের কারুকাজ এখনো চোখে পড়ে। মসজিদের ভেতরে অবকাঠামোতে এক একটি খিলানের ৮ ফুট উপর থেকে গম্বুজের স্থাপনা শৈলী পর্যায় ক্রমে গম্বুজের কেন্দ্র বিন্দুতে গিয়ে মিলিত হয়েছে।

এই অবকাঠামোতে মসজিদটি শক্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে। অপরূপ কারুকার্য মন্ডিত মসজিদের ভেতরে মধ্যযুগীয় সৌন্দর্যের শোভা লক্ষ্যণীয় ভাবে ফুটে উঠেছে। মসজিদের ভেতরে ছোট ছোট সুন্দর কাজ লক্ষ্য করা যায়। পূর্ব দিকে মসজিদের একটি প্রবেশ পথ রয়েছে।

উত্তর ও দক্ষিণে একটি করে মোট দুটি জানালা রয়েছে। মসজিদের ভেতরের পশ্চিম দিকে মধ্যভাগে একটি বড় মিম্বর এবং দুপাশে অনুরূপ দুটি ছোট মিম্বর রয়েছে।

মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ পাশে জানালার দুপ্রান্তে দুটি করে মোট চারটি চূড়ঙ্গী রয়েছে। এগুলোতে মসজিদের সংরক্ষিত কোরআন, কিতাব ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী রক্ষণা বেক্ষণ করা হয়। এ জামে মসজিদটি সুদীর্ঘকাল থেকে স্থানীয় মুসল্লিদের একমাত্র নামাজ আদায়ের কাজ করছে।

এ মসজিদে একটি মিনার রয়েছে তার উচ্চতা ৬০ ফুট। প্রতিদিন অসংখ্য লোক এখানে নামাজ আদায় করেন। তাছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থান থেকেও ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদটি দেখার জন্য বহু লোকের সমাগম ঘটে এ মসজিদে। অভিযোগ আছে যে, মসজিদের আরবী হরফের শিলালিপিটি জোর করে পশ্চিম পাড়ার লোকজনরা নিয়ে যায়। সেটি উদ্ধার এখনো সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।

সেই শিলালিপিটি উদ্ধার হলে এ মসজিদের সঠিক নির্মাণ কাল জানা যেতো বলে অনেকেই মনে করেন। পরবর্তী সময়ে এখানে একটি বাংলা শিলালিপি রাখা হয়েছে। পুরনো এ টেঙ্গর শাহী মসজিদটি এই জনপদে মুসলিম নিদর্শন হিসেবে কাজ করছে।

টেঙ্গর শাহী মসজিদটিতে বর্তমানে সংস্কার কাজ চলছে। পুরনো অবকাঠামো সব ঠিক রেখে এই মসজিদে নির্মাণ কাজে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। জনবহুল এলাকায় এ পুরনো মসজিদে নামাজ আদায়ে

সমস্যার কারণে মসজিদের বারান্দাকে ব্যবহার করে মসজিদটিতে দ্বিতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এখন এ মসজিদে প্রায় সাড়ে ছয়শ’ মুসল্লি এক সাথে নামাজ আদায় করতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here