অমর কাহিনী রামপালের রাজা বল্লাল সেন

download

মোহাম্মদ সেলিম:

বঙ্গে সেন রাজাদের মধ্যে সেন রাজ বংশের দ্বিতীয় প্রভাবশালী রাজা ছিলেন বল্লাল সেন। তিনি প্রাচীন বিক্রমপুরের রামপাল থেকে ১১৬০ সাল থেকে ১১৭৯ সাল পর্যন্ত সেন বংশের বঙ্গ শাসন করেন। রাজা বল্লাল সেন ছিলেন সেন রাজ বংশের প্রতিষ্ঠাতা বিজয় সেনের পুত্র। রাজা বল্লাল সেন বঙ্গের পশ্চিমে চালুক্য সাম্রাজ্যের রাজকুমারী রমাদেবিকে বিয়ে করে ছিলেন।

সেই সময়ে রাজা বল্লাল সেনের রাজকীয় বিয়ে দক্ষিণ ভারতের সঙ্গে সেন শাসকদের ঘনিষ্ঠ সামাজিক যোগাযোগের ইঙ্গিত বহন করে। রাজা বল্লাল সেন রামপালে ১০৮৩ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি মৃত্যু বরণ করেন ১১৭৯ সালের দিকে।

রাজা বল্লাল সেন বঙ্গের সামাজিক সংস্কার প্রথা পরিবর্তন করে ছিলেন। এরমধ্যে বিশেষ করে কৌলীন্য প্রথা প্রবর্তনকারী হিসেবে তিনি সবচেয়ে পরিচিত লাভ করেন। তিনি ওষধিনাথ নামক এক দাক্ষিণাত্য ব্রাহ্মণ বংশ জাত ছিলেন। এ কারণে সেন রাজাদেরকে ‘দ্বিজরাজ ওষধি নাথ বংশজ’ বলে উল্লেখ করা হয়ে থাকে।

তিনি ছিলেন একজন পণ্ডিত ব্যক্তি। তিনি লেখক হিসেবেও পরিচিত লাভ করে ছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য বই হচ্ছে ব্রত সাগর, আচার সাগর, প্রতিষ্ঠা সাগর, দান সাগর এবং অদ্ভুত সাগর।

রাজা বল্লাল সেন তাঁর দান সাগর বইয়ে শিক্ষাদান বিষয়ে শেখা ও শেখানোর আদর্শ পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া বিষয়ে আলোচনা করেন। সেই সময়ে ‘ভূমিদান’ ও ‘শিক্ষাদান’ নামক দুই বইয়ের মধ্যে সেন আমলে বাংলায় সংস্কৃত উচ্চ শিক্ষার প্রচলিত ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়।

শিক্ষা প্রক্রিয়ার বাচনিক বা কথ্যধারা ‘শিক্ষা দান’ বইয়ে এ বিষয়ে ধারণার অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে ছিল। দান সাগর-বইয়ে শিক্ষকের গুণাবলি বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। দান সাগর বইয়ের মতে, যে শিক্ষক অর্থ প্রকাশের উপযুক্ত বাগ্ধারা ও উচ্চারণের প্রাসঙ্গিক কৌশল সমূহে পারঙ্গম হয়ে শিক্ষণীয় বিষয়ের অন্তর্নিহিত তত্ত্ব সব যুক্তি পরম্পরায় প্রকাশে সমথ হবে তিনি গুণময় শিব শম্ভুর সমতুল্য।

সূর্যের আলো ব্যতিরেকে যেমন পৃথিবী তমসাচ্ছন্ন। তেমনি শাস্ত্র সমূহ শিক্ষকের ব্যাখ্যা ব্যতিরেকে দুর্বোধ্য হয়ে ঊঠে। উচ্চারণের কৌশল রপ্ত করে সঠিক উচ্চারণে পারঙ্গম না হলে এবং ব্যাকরণ, অলংকার ও ন্যায় শাস্ত্রে পারদর্শী না হলে, শাস্ত্রেও অন্তর্নিহিত তত্ত্ব ও যুক্তি পরম্পরা উপলব্ধি ও ব্যক্ত করা সম্ভব নয় বলে তাঁর বইয়ে আলোচনা করা হয়।

শিক্ষা প্রক্রিয়ায় বাচনিক ধারার প্রাধান্য বা একাধিপত্য এই আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। এখানে মনে রাখতে হবে প্রাক্ পাণিনি বৈদিক ভাষায় বহু ক্ষেত্রেই উচ্চারণ ভেদে অর্থভেদ ঘটত। কাজেই উচ্চারণ বিধি বা কৌশল রপ্ত করা শিক্ষকের অবশ্য কর্তব্য ছিল।

সে জন্য সেই যুগের ছন্দোবদ্ধ আবৃত্তি ছিল একটি সুকুমার কলা। শিক্ষকের মুখ থেকে শোনা মন্ত্র নির্দিষ্ট ছন্দে ও ধ্বনিসহযোগে শিষ্যকে আয়ত্ত করে স্মৃতিতে ধরে রাখতে হতো। এ প্রসঙ্গে এ কথাও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে রাজা বল্লাল সেনের আমলে শিক্ষা-প্রক্রিয়ায় পাণ্ডুলিপির কিছু স্থান ছিল।

এমন সাক্ষ্যও পাওয়া যায়। রাজা বল্লাল সেন তাঁর দান সাগর-এ কিভাবে পুঁথি নকল বা অনুলিপি করতে হবে, কিভাবে তা সংশোধন করতে হবে সে সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তা ছাড়া প্রতিপাদ্য বিষয়ের যথোচিত ব্যাখ্যা এবং এই ব্যাখ্যা যথার্থভাবে শ্রুতিগোচর করার নিয়ম ও পড়ার পদ্ধতি বিষয়েও তিনি আলোচনা করেছেন।

দান সাগর বইয়ে বলা হয়েছে, পাণ্ডুলিপির বা পুঁথির অনুলিপিকারক পূর্বমুখী হয়ে সোনা, রুপা বা হাতির দাঁত অথবা ভালো কাঠের উপযুক্ত লেখনির সাহায্যে মূল পাণ্ডুলিপির বিষয়সমূহ ভূর্জপত্রে বা অন্যপত্রে লিপিবদ্ধ করবে। অনুলিপির পত্রগুলো আকারে লেখা অংশের দ্বিগুণ হবে। অনুলিপি সাঙ্গ হলে মূল পাণ্ডুলিপির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে সঠিক লিপি হয়েছে কি না।

কিভাবে এই পাণ্ডুলিপির বিষয়সমূহ শিক্ষক পাঠ ও ব্যাখ্যা করবেন, সে বিষয়েও আলোচনা করা হয়েছে। শিক্ষক হবেন একজন দক্ষ, বুদ্ধিমান ও পণ্ডিত ব্রাহ্মণ। যিনি শুধু লিপির অর্থ উদ্ধারেই সমর্থ হবেন না। সেই সঙ্গে ছন্দবিজ্ঞান ও শব্দশাস্ত্রেও তাঁর ব্যুৎপত্তি থাকতে হবে। তিনি হবেন সুকণ্ঠের অধিকারী এবং যথার্থ উচ্চারণে পারঙ্গম। তা ছাড়া বিদ্যার বিভিন্ন শাখায় থাকবে তাঁর অধিকার।

দান সাগর বইয়ে উল্লিখিত যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষক নিশ্চয়ই সহজলভ্য ছিল না। শিক্ষককে উজ্জ্বল সূর্যের সঙ্গে তুলনা করে বলা হয়েছে, সূর্য যেমন পৃথিবী থেকে অন্ধকার দূর করে, তেমনি শিক্ষক তাঁর প্রাজ্ঞ উচ্চারণের দ্বারা শিক্ষার্থীর মনের অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করেন। শিক্ষার্থী কিভাবে শিক্ষকের ব্যাখ্যা শুনবে এবং কিভাবে পাণ্ডুলিপি পাঠ করবে, সে বিষয়েও দান সাগর বইয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। শিক্ষার্থী শিক্ষকের দিকে মুখ করে গভীর মনোযোগের সঙ্গে শিক্ষকের পাঠ ও ব্যাখ্যা শুনবে।

কোনোভাবেই অন্যমনস্ক হবে না বা শিক্ষকের পড়ানোয় ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে না। কোনো বিষয়ে সন্দেহ থাকলে, শিক্ষকের ব্যাখ্যা শেষ হলে তবেই ছাত্র তা বিনম্রভাবে ব্যক্ত করবে। কিন্তু কোনোক্রমেই শিক্ষকের ব্যাখ্যার প্রতিবাদ বা বিরোধিতা করবে না।

##রাজা বল্লাল সেন বারো শতকের শুরুতে বাংলার শাসনভার গ্রহণ করে ছিলেন। বল্লাল সেনের বাবা বিজয় সেন তার কিছুকাল আগে বাংলার সিংহাসন অধিকার করে ছিলেন। রাজা বল্লাল সেন বা সেন বংশের রাজত্বের আগে বাংলায় তিন’শ বছরের অধিক সময় পাল রাজাদের শাসনে ছিল।

পাল রাজারা বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। খ্রিষ্টিয় দশম শতকে পাল শক্তির পতন বৌদ্ধ ধর্মের ওপর আঘাত হানে। পাল রাজাদের আমলে ব্যাপকভাবে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত বাংলায় পরবর্তীকালে ব্রাহ্মণ ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রভাব বিস্তারে সেন রাজাদের ভূমিকা ও অবদান অনস্বীকার্য হয়ে উঠে। তা সত্ত্বেও মধ্যযুগে ব্রাহ্মণবাদ বা শাস্ত্রের কঠোর নিয়মসমূহের কিছু সংশোধন বা সংস্কার সাধন করে অনেকটাই নমনীয় করে তোলা হয়।

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন বর্ণনা থেকে সংগতভাবেই অনুমান হয়, সেই সময় পাঠারম্ভের সংস্কার হিসেবে উপনয়ন সংস্কার তার তাৎপর্য হারিয়ে শুধু দ্বিজ সংস্কার বা পৈতে সংস্কারে পর্যবসিত হয়ে ছিল। এই সময়েই বাংলায় আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ধারার প্রবর্তন হয়। যা টোল নামে পরিচিত লাভ করে।

সাধারণভাবে, সেন যুগে অর্থাৎ এগারো ও বারো শতকে সংস্কৃত উচ্চ শিক্ষা বাংলায় যথেষ্ট প্রসার লাভ করে ছিল বলেই অনুমান করা যায়। সেন বংশের কুল প্রধান সেন রাজা বল্লাল সেন ব্রাহ্মণ শাস্ত্রীয় শিক্ষাচর্চা বা সংস্কৃত উচ্চ শিক্ষার একজন প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ঢাকার নামকরণের সঠিক ইতিহাস নিয়ে ব্যাপক মতভেদ রয়েছে।

কথিত আছে যে, সেন বংশের রাজা বল্লাল সেন বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভ্রমণকালে সন্নিহিত জঙ্গলে হিন্দু দেবী দুর্গার একটি বিগ্রহ খুঁজে পান। দেবী দুর্গার প্রতি শ্রদ্ধাস্বরূপ রাজা বল্লাল সেন ঐ এলাকায় একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। যেহেতু দেবীর বিগ্রহ ঢাকা বা গুপ্ত অবস্থায় খুঁজে পাওয়া গিয়ে ছিলো,

তাই রাজা, মন্দিরের নাম রাখেন ঢাকেশ্বরী মন্দির। মন্দিরের নাম থেকেই কালক্রমে স্থানটির নাম ঢাকা হিসেবে গড়ে ওঠে।

১০৬০ সালে রামপাল নগরে বল্লাল সেনের জন্ম হয়। তার পিতা বিজয়সেন গৌড়াধিপতি চন্দ্রসেনের কন্যাকে বিলাস দেবিকে বিয়ে করে ছিলেন। শৈব বরে তার জন্ম হওয়ায় বিজয়সেন পুত্রের নাম রাখেন ‘বরলাল’। পরবর্তীতে ‘বল্লাল’ নামে তিনি পরিচিতি লাভ করেন।

চৌদ্দ বছর বয়সেই তিনি অস্ত্র বিদ্যায় ও শাস্ত্র বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠেন। ১১৬৮ সালে তিনি দান সাগর রচনা করেন এবং ১১৬৯ সালে অদ্ভুত সাগর রচনা শুরু করলেও পরবর্তীকালে তা সমাপ্ত করতে পারেন নি।

পিতার মতো তিনিও শিবের উপাসক ছিলেন। অন্যান্য রাজকীয় উপাধির সঙ্গে তিনি ‘শঙ্কর’ উপাধি গ্রহণ করে ছিলেন। তিনি দক্ষিণ ভারতের পশ্চিম চালুক্য সাম্রাজ্যের রাজকন্যা রমাদেবিকে বিয়ে করেন। অদ্ভুত সাগর গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, বৃদ্ধ বয়সে রাজা বল্লাল সেন রাজ্যভার নিজ পুত্র লক্ষ্মণ সেনকে অর্পণ করেন।

বল্লাল সেন জীবনের শেষ দিনগুলি রমাদেবীকে নিয়ে ত্রিবেণীর কাছে গঙ্গা তীরবর্তী একটি স্থানে অতিবাহিত করেন। বল্লাল সেনের সময়কার নৈহাটি তাম্র শাসন এবং সনোকার মূর্তিলিপি নামে দুইটি লিপি-প্রমাণ আবিষ্কৃত হলেও এগুলিতে তার বিজয় সম্পর্কে কোন উল্লেখ নেই। অদ্ভুত সাগর গ্রন্থানুসারে গৌড়ের রাজার সঙ্গে বল্লাল সেনের যুদ্ধ-বিগ্রহের উল্লেখ পাওয়া যায়।

এই গৌড়রাজকে পাল বংশের রাজা গোবিন্দ পালের সঙ্গে অভিন্ন বলে শনাক্ত করা হয়। গ্রন্থে এছাড়াও উল্লেখ রয়েছে, বল্লাল সেন মগধে পালদের ওপর চূড়ান্ত আঘাত হানেন এবং পিতা বিজয় সেনের শাসনকালে মিথিলা জয় করেন। মাতামহ ও পিতার উত্তরাধিকারি সূত্রে তিনি গৌড় ও বঙ্গ দুইটি রাজ্যের অধিকার প্রাপ্ত হন।

পরবর্তীতে বরেন্দ্র ভূমি, রাঢ়, বঙ্গ, বগ্দি এবং মিথিলা জয় করেন। পাল রাজবংশ এবং বৌদ্ধ রাজত্ব নি:শেষ করে বাংলায় সনাতন ধর্ম পুন:স্থাপন করেন। তিনি বৌদ্ধদের বহু মঠ ও সংঘকে দেবালয়ে পরিণত করে ছিলেন।

দ্বাদশ রাজ্যের অধিপতি হিসেবে তিনি সার্বভৌম সম্রাট উপাধি ধারণ করেন। বল্লাল সেন প্রায় ১৮ বছর রাজত্ব করে ছিলেন। সম্মানলাভার্থে প্রজারা সৎপথে চলবে। এই উদ্দেশ্যে বল্লাল সেন কৌলিন্য প্রথা সৃষ্টি করে ছিলেন। শ্রোত্রিয়দের মধ্যে যাঁরা নবগুণ বিশিষ্ট ছিলেন,

বল্লাল তাঁদের কুলীন উপাধি দিয়ে ছিলেন। তাঁর এই নবগুণ গুলো হল : আচার, বিনয়, বিদ্যা, প্রতিষ্ঠা, তীর্থ দর্শন, নিষ্ঠা, শান্তি, তপ ও দান। এগুলি ‘কুল লক্ষণ’ নামে পরিচিত ছিল।

কৌলিন্য পরিবর্তন বল্লাল নিয়ম করে ছিলেন যে, প্রতি ছত্রিশ বছরের শেষে এক এক বার বাছাই হবে, গুণ ও কর্ম অনুযায়ী কুলীন ও অকুলীন নির্বাচিত হবে। এই প্রক্রিয়াকে সমীকরণ বলা হয়। এই সমীকরণ তার পরবর্তী বংশধরেরা চালিয়ে যাবে।

কুলমর্যাদা লাভার্থে সবাই ধার্মিক ও গুণবান হতে চেষ্টা করবে। এই ছিল রাজার উদ্দেশ্য। ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যা সাগর, রামগতি তর্করত্ন প্রভৃতি বিজ্ঞ রাঢ়ীয় পন্ডিতেরা বল্লাল সেনকেই কৌলিন্যের সৃষ্টিকর্তা বলেছেন।

জ্ঞানের প্রতি বল্লাল সেনের যথেষ্ট অনুরাগ ছিল। শিলালিপির প্রশস্তিকার তাকে “বিদ্বানমন্ডলীয় চক্রবর্তী ” বলে প্রশংসা করা হয়েছে। বল্লালসেন তার জীবদ্দশায় পাঁচটি গ্রন্থ রচনা করেন। সেগুলো হচ্ছে দান সাগর ১১৬৮ খ্রিষ্টাব্দে সমাপ্ত হয়। অদ্ভুত সাগর লহ্মণ সেন সমাপ্ত করেন। ব্রত সাগর ও আচার সাগর। প্রতিষ্ঠা সাগর এর সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায়নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here