আব্দুল জব্বার খান বিক্রমপুরের সন্তান

fb.মোহাম্মদ সেলিম:

আবদুল জব্বার খান বিক্রমপুরের সন্তান। আব্দুল জব্বার খান বাংলাদেশের তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এর সময়ে প্রথম সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশের পরিচালক হিসেবে অভিনেতা এবং চিত্রনাট্যকার ছিলেন। এ ছায়াছবিটি নির্মিত হয় ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি একাধারে চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক ও অভিনেতা ছিলেন।

mnews-eid-wishতিনি মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার মসদগাঁও গ্রামে ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে ১৬ এপ্রিল ও বাংলা সনের ১৩২২ সালের ৭ই বৈশাখ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হচ্ছে হাজী মোহাম্মদ জমশেদ খান। চার ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁর বাবা হাজী মোহাম্মদ জমশেদ খান সেই সময়ে আসামের ধুবড়ী এলাকায় পাটের ব্যবসা করতেন।

প্রমথেশ বড়ুয়ার সাথে পরিচয়ের সূত্রে তিনি কলিকাতা গিয়ে তাঁর বাসায় থেকে নাটক দেখতেন। প্রমথেশ বড়ুয়ার মুক্তি চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয়ের কথা ছিল। কিন্তু প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারণে তিনি তা করতে পারেননি। পরে প্রমথেশ বড়ুয়ার শাপ মুক্তি চলচ্চিত্রে তাকে অভিনয় করার জন্য নির্বাচিত করা হয়। তাতে পিতার কাছ থেকে অনুমতি না পাওয়ায় তিনি সেই চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে পারেননি।

তবে তিনি নিয়মিত মঞ্চ নাটক করেছেন। প্রমথেশ বড়ুয়া পরিচালিত সিন্ধু বিজয় নাটকে তিনি অভিনয় করেন। নবম ও দশম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তিনি নাটকের মূল চরিত্রে অভিনয় করেন। আসামের গৌহাটিতে পরিচালনা করেন টিপু সুলতান। তিনি সমাজপতি ও মাটির ঘর নাটকে অভিনয় করে স্বর্ণপদক পান।

এছাড়া তিনি বেহুলা, বিল্বমঙ্গল, সতীতীর্থ ও সোহরাব রোস্তমসহ একাধিক নাটকে অভিনয় করেছেন।
আবদুল জব্বার খান আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল থেকে ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে ডিপ্লোমা নিয়ে চাকরিতে যোগ দেন। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কলিকাতা থেকে স্থায়ী ভাবে ঢাকায় ফিরে আসেন।

তিনি কমলাপুর ড্রামাটিক এ্যাসোসিয়েশন গঠন করেন। সেখানে তিনি নাটক মঞ্চায়ন ও রচনায় মনোযোগ দেন। এ সংগঠনের উদ্যোগে তিনি টিপু সুলতান ও আলীবর্দী খান নাটক মঞ্চায়ন করেন।
সেই সময়ে তাঁর উল্লেখ যোগ্য মঞ্চ নাটক হচ্ছে বঙ্গে বর্গী, প্রতিজ্ঞা, মেয়ে ও ডাকাত। তিনি ঈশা খাঁ ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে ও জাগোদেশ ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে রচনা করেন।

১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে ইকবাল ফিল্মসের ব্যানারে তাঁর রচিত ডাকাত নাটকটি এই ভূখণ্ডের প্রথম চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ এর কাজ শুরু করেন আব্দুল জব্বার খান। পরবর্তীতে ডাকাত নাটকটি উপন্যাস হিসেবে প্রকাশিত হয়।

১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে ৩ আগস্ট বাংলাদেশের প্রথম সবাক বাংলা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ মুক্তি পায়। ছবির প্রথম প্রদর্শনীতে প্রধান অতিথি ছিলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। এ চলচ্চিত্রটি পরিচালনার সাথে এর মূল চরিত্রে অভিনয় করেন আবদুল জব্বার। আর এ চলচ্চিত্রে তাঁর ছেলেবেলার চরিত্রে অভিনয় করেন তাঁর ছেলে মাস্টার জুলু। নায়িকা চরিত্রে অভিনয়ে ছিলেন চট্টগ্রামের পূর্ণিমা সেন।

অন্যান্য চরিত্রে ছিলেন ইনাম আহমেদ, নাজমা পিয়ারী, জহরত আরা, আলী মনসুর, রফিক, নুরুল আনাম খান, সাইফুদ্দিন ও বিলকিস বারী। এ ছায়াছবিতে চিত্রগ্রাহক ছিলেন কিউ.এম জামান। সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালনায় ছিলেন সমর দাস। কণ্ঠশিল্পী আবদুল আলীম ও মাহবুবা হাসানাত এই চলচ্চিত্রের সাথে যুক্ত ছিলেন।
এরপর তিনি যেসব ছবি পরিচালনা করেন সেগুলো হচ্ছে জোয়ার এলো। এটি নির্মিত হয় ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে।

উর্দুতে ১৯৬৩ খিষ্টাব্দে নির্মিত হয় নাচঘর। বাঁশরী নির্মিত হয় ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে। কাঁচ কাঁটা হীরা নির্মিত হয় ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে। খেলারাম নির্মিত হয় ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে। এরমধ্যে তিনি উজালা নামে একটি ছায়াছবি প্রযোজনা করেন। তিনি ষাটের দশকে প্রথম ভাগে গঠিত পাকিস্তান পরিচালক সমিতির অন্যতম সংগঠক ছিলেন।

১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিবনগর সরকারের চলচ্চিত্র বিভাগের প্রধান হিসেবে আবদুল জব্বার খান কাজ করেন। তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ সংস্থা পপুলার স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করেন। চলচ্চিত্র বিষয়ক বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন।

চলচ্চিত্র ক্ষেত্রে অবদানের জন্য তিনি বাচসাস পুরস্কার, এফডিসি রজত জয়ন্তী পদক, উত্তরণ পদক, হীরালাল সেন স্মৃতি পদক, বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন স্বর্ণপদক, চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সম্মাননা পদক, ফিল্ম আর্কাইভ সম্মাননা প্রতীক, রেইনবো ফিল্ম সোসাইটি সম্মান পদক ইত্যাদি লাভ করেন।

তিনি বাংলাদেশে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি। তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জুরি বোর্ড ও ফিল্ম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন দীর্ঘ বছর।

২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে চলচ্চিত্র কর্মীদের দাবির মুখে সোনারগাঁও সার্ক ফোয়ারা থেকে এফডিসি ছাড়িয়ে টঙ্গী ডাইভারশন রোড পর্যন্ত সড়কটি ‘আব্দুল জব্বার খান সড়ক নামে অনুমোদন করা হয়।
১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে ২৮ ডিসেম্বর আবদুল জব্বার খান হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় নিজের বাসায় মৃত্যুবরণ করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here