রাসিক মেয়রের কাছে কুঁড়ে ঘরগুলো উচ্ছেদ না করার আকুতি ৪ পরিবারের

River sideমাসুদ রানা রাব্বানী, রাজশাহী:

নির্দেশ পাওয়ার পর, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন’র কাছে পদ্মার পাড়ে নিজেদের করা কুঁড়ে ঘরগুলো উচ্ছেদ না করার আকুতি জানাল চার পরিবার।

বস্তি ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৭-১৮ বছর ধরে পদ্মার পাড়ে ময়লা আবর্জনা ফেলা পরিত্যক্ত জায়গাটিতে মাটি ভরাট করে কুঁড়ে ঘরগুলো বানিয়ে বসবাস করে আসছেন ছিন্নমূল এই পরিবারগুলো । বর্ষার পানি ঢুকে ঘর ভরে যায়, গরমে ঘরের টিন- নদীর বালুর তপ্ততা আর দারিদ্র্যের কষাঘাত সব সহ্য করে এতগুলো বছর তাদের একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল এই কুঁড়ে ঘরগুলোই।

240826618_1161781934311841_783543041354622350_nকিন্তু এ বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারিতে তাদের ঘরগুলোর পাশ দিয়েই বিনোদন প্রিয় মানুষের জন্য গড়ে ওঠা শোভাবর্ধনকারী ঝুলন্ত ব্রিজটির উদ্বোধন হয়। আনন্দে মেতে ওঠেন বিনোদন প্রিয় নগরবাসী। কিন্তু ব্রিজ উদ্বোধনের পর থেকেই তাদের শুনতে হয়, তোমাদের আর এখানে থাকতে দেব না, তোমাদের বস্তির ঘর ব্রিজের সৌন্দর্য নষ্ট করছে, এখানে সুন্দর রেস্টুরেন্ট হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। অজানা শঙ্কায় দিন কাটতে থাকে তাদের।

এদিকে গত সোমবার ও তার আগেও দু’একদিন সিটি কর্পোরেশন থেকে তাদের ঘর গুলো উঠিয়ে নিতে বলা হয়। সর্বশেষ সোমবার সকালে তাদেরকে বিকাল পাঁচটার মধ্যে ঘর সরিয়ে না নিলে সিটি কর্পোরেশন ঘরগুলো ভেঙে দেবে বলে নির্দেশনা দিয়ে যান।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ ঘরগুলো ভাঙতে আসলে, বস্তির মানুষগুলো বলে, স্যার, আমরা যাব কোথায়, আমাদের তো যাবার কোন জায়গা নেই ; তখন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাদেরকে আবারও ৭ দিনের সময় দিয়ে যান।

উল্লেখ্য, নগরীর দরগাপাড়ার দরগার মূল গেটের সামনেই রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন’র তৈরী করা দৃষ্টি নন্দন ব্রীজটির ঠিক নিচেই নদীর ধারে চারটি অসহায় হতদরিদ্র পরিবার কোন রকম ঝুপড়ি তুলে বসবাস করে। ১৯৫৭ সালে নদীতে সব খেয়ে নেয়া বরিশালের এতিম নবাব আলী (৮২), ৪০ বছর আগে মাগুরা থেকে আসা সহায় সম্বলহীন মতিয়ার রহমান (৭০), মানসিক ভারসাম্যহীন বিউটি ওরফে কুটি(৩২) আর দিনমজুর জলিল মিয়া

(৭০)… এই মিলে চারটি পরিবার এখানে থাকে। তবে সবারই রয়েছে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন এলাকার ঠিকানাসহ জাতীয় পরিচয় পত্র। এদের সাথে থাকে শিশু অধিকারের লেশমাত্র ছোঁয়া না পাওয়া কুরবান (৬), সুরাইয়া (৫) আর রাহান (৮)। কুরবান আর সুরাইয়ার মা কুটি (৩২) মানসিক ভারসাম্যহীন, বাবা ওয়াদ আলী রাগারাগি করে কোথায় চলে গেছে কেউ জানে না। রাহান (৮) এর মা আজিরন (৩৫) আর বাপ দিন মজুর জলিল (৪৬)।

এখানে থাকা নবাব আলী বলেন, আমাদের কোথাও থাকার জায়গা নেই, এ কারনে এখানে ঘর তুলে থাকি, অনেক দিন হলো, কোনরকম ভাবে দু’বেলা দু’মুঠো ভাত জোগাড় করে বেঁচে আছি। কিন্তু ব্রীজটি হবার পর থেকেই নানান মানুষ নানান কথা বলছে। কেউ বলছে, এখানে রেস্টুরেন্ট বানাবো, তোরা অন্য কোথাও চলে যা, আবার কেউ বলছে তোদের এই ঘর গুলোর জন্য সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। আমাদেরতো আর কোথাও যাবার জায়গা

নাই, যাব কোথায় ? থাকবো কোথায় আমরা ? তবে আমরা জানি, আমাদের এই দুঃখ দূর্দশার কথা যদি নগর পিতা এএইচএম খায়রুজজামান লিটনের কানে পৌছায়, তাহলে তিনি নিশ্চয় আমাদের জন্য একটা ব্যবস্থা করবেন।

মানসিক ভারসাম্যহীন বিউটি ওরফে কুটি বলেন, আমরা এখান থেকে কোথাও যাব না, একটু একটু করে মাটি তুলে ভরাট করে আমরা এখানে ঘর বানিয়েছি ; প্রতিবছর বর্ষার সময় আমাদের ঘরে পানি উঠলে ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে বাঁধের ওপর খোলা আকাশের নীচে দিনের পর দিন কাটাতে হয়, তবুও এখানেই থাকি, আল্লাহ্র দুনিয়ায় আর তো কোন কিছুই নাই আমাদের।

দিনমজুর বৃদ্ধ মতিয়ার রহমান (৭০) বলেন, শুনতে পাই এদেশে কেউ নাকি ঘরহীন থাকবে না, বিভিন্ন জায়গায় ভূমিহীনদের জন্য সরকার ঘর বাড়ি দিচ্ছে ; আমরাও তো ভূমিহীন, তাহলে আমরা কি একটা স্থায়ী বসবাসের জায়গা পাবোনা ??

রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বলেন, রাষ্ট্রের প্রয়োজনে যে কোন জায়গাই খালি করতে হতে পারে, তাতে কোন নাগরিকের বাধা দেবার ক্ষমতা নাই ; তবে এ ধরনের উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসন ব্যবস্থাও করতে হবে ; সংবিধানে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের ৫টি মৌলিক অধিকারের মধ্যে বাসস্থান একটি, তাদেরকে থাকার জায়গা অবশ্যই করে দিতে হবে, নইলে সংবিধান লঙ্ঘিত হবে।

এ বিষয়ে উচ্ছেদ কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেয়া রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট
মুহাম্মদ ইমরানুল হক’কে উচ্ছেদের উদ্দেশ্য ও উচ্ছেদ হওয়া মানুষগুলোর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলরের সাথে কথা বলুন।

এর পর রাসিক ১২ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ( অতিরিক্ত দায়িত্ব ৯ নং ওয়ার্ড ) ও প্যানেল মেয়র-১ শরিফুল ইসলাম বাবু’র কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পদ্মাপাড়ের সৌন্দর্য বর্ধন ও বিনোদন কেন্দ্রগুলোর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বৃদ্ধি, গরু ছাগলসহ ময়লা আবর্জনা মুক্ত করার জন্যই এ কার্যক্রম। এটা সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন নগরীর বৃহত্তর স্বার্থে।

তারা তো দীর্ঘ দিন এখানে বসবাস করছে এখন যাবে কোথায় ? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অবৈধ দখলদারদের পুনর্বাসনের কোন ব্যবস্থা আমাদের কাছে নেই, নগরীর বহু মানুষের ঘর-বাড়ি নাই, তারা ভাড়া থাকে, এরাও থাকুক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here