মুন্সীগঞ্জে নাটেশ্বরে আবিস্কার হচ্ছে একের পর এক পুরাকীর্তি

মোহাম্মদ সেলিম
মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলার সোনারং ইউনিয়নের নাটেশ্বর দেউল এলাকায় বৌদ্ধ বিহারে জরিপ ও খনন কাজে বৌদ্ধ ধর্মের প্রত্নতত্ত্ব আবিস্কারের ঘটনা ঘটছে। একের পর এক আবিস্কারে প্রত্নতত্ত্ব পাওয়া যাচ্ছে এখানে। এখানে আবিস্কারের ঝুলিতে প্রত্নতত্ব যোগ হচ্ছে।

সর্বশেষ এখানে আবিস্কারে পাওয়া গেছে বৌদ্ধ ধর্মের সবচেয়ে গুরুত্ব পূর্ণ ‘ধর্মচক্র’। বৌদ্ধরা ‘ধর্মচক্র’টি খুব গুরুত্বসহ কারে দেখে থাকেন। এ ‘ধর্মচক্রে’ আটটি স্পোক রয়েছে। প্রকারবেদে চক্রে স্পোক কম ও বেশি হয়ে থাকে। ভারতের জাতীয় পতাকায় এ ধরণের চক্রে অনেক স্পোক দেখা যায়।

এখানকার আবিস্কারের আগে বাংলাদেশে আর কোথাও ‘ধর্মচক্র’ পাওয়ার খাবর পাওয়া যায়নি। এছাড়া ভারত উপমহাদেশের কোথাও ‘ধর্মচক্র’ পাওয়ার খবর এখনো পাওয়া যায়নি।
নাটেশ্বর বৌদ্ধ বিহারে খনন কাজ শেষে এটি খুলে দেয়া হলে এটি পর্যটন আকর্ষনে বিশেষ ভুমিকা রাখবে বলে অনেকে মনে করেন।

এখানকার এ কাজের বিষয়ে চীন সরকারের সাথে ইতোমধ্যে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর হয়েছে। তাতে এখানে পরবর্তীতে চীন সরকার এখানে প্রায় ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সাধারণত ‘ধর্মচক্র’ স্তুপের তোরণ বা অশোক স্তম্ভের শীর্ষে শোভাবর্ধণ করে থাকে। কিন্তু

অন্ধপ্রদেশের অমরাবাতি এবং নাগার্জুনকোন্ডা স্তুপের বেদিতে এখানকার আবিস্কৃত ‘ধর্মচক্রে’র অনেকটা অনুরূপ আবিস্কৃত হয়ে ছিলো বলে প্রত্নতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

আবিস্কারের অংশে ‘ধর্মচক্রে’র সাথে এখানে আরো কিছু মূল্যবান অংশ আবিস্কারে আবিস্কার হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে অষ্টাকোনাকৃতির স্তুপ, ইটের দেয়াল, সীমানা প্রাচীর, হলরুম বা মন্ডপ ঘর। এগুলো হাজার বছর আগের প্রাচীন নিদর্শন বলে আবিস্কাররা ধারণা করছেন।

বিক্রমপুরের নাটেশ্বর দেউলে এবারের আবিস্কার বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আবিস্কার কারকরা। পঞ্চম ধাপের আবিস্কারে রয়েছে স্তুপের আদি পর্যায়ের অষ্টাকোণাকৃতি স্তুপের দেয়ালের গাঁথুনী। এ গাঁথুনী এখনো অপূর্ব ও মসৃণ। এটি আধুনিক সিরামিক ইটের গাঁথুনী বলে মনে হয়। দেয়ালের ইট, পরিমাপ, গাঁথুনী সেও আবার কাদামাটির মর্টার।

এখানকার প্রাচীন আমলের নির্মাণ শৈলি অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় বহন করে। এখানকার নির্মাণে বর্গাকার ভিত্তির ওপর উলম্বভাবে ইট স্থাপন করা হয়েছে। এখানকার ‘ধর্মচক্রে’র স্তুপে গরুগাড়ির চাকার মতো ‘ধর্মচক্র’ নির্মাণ করা হয়েছে। ইতোপূর্বে আবিস্কার হয় প্রথম ও চতুর্থ অষ্টাকোকৃতির স্তুপে আদি পর্যায়ে ‘ধর্মচক্রে’র

আভাস দেখা গিয়ে ছিল। সদ্য আবিস্কৃত পঞ্চম অষ্টাকোকৃতির স্তুপের ‘ধর্মচক্র’টিতে আটটি স্পোক রয়েছে। প্রতিটি স্পোকের সংখ্যা বৌদ্ধ ধর্মের প্রতীকী অর্থে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করে থাকে।
বৌদ্ধ ধর্মের মহাপন্ডিত অতীশ দীপংকরের জন্ম ভূমি হচ্ছে প্রাচীন বিক্রমপুরের মুন্সীগঞ্জ সদরের বজ্রযোগিনী গ্রামে। এ গ্রামের মাইল তিনেক পশ্চিমে হচ্ছে নাটেশ্বর দেউল।

অতীশ দীপংকর এই নাটেশ্বরে বৌদ্ধ বিহারেই বৌদ্ধের ধর্মের আরাধনা করতেন বলে ধারণা করা হয়। অতীশ দীপংকরের কারণে ৯০০ খ্রিস্টাব্দে এখানে বৌদ্ধ বিহার নির্মিত হয় বলে ইতিহাসবিদরা মনে করছেন। একাধিক আবিস্কারের মধ্যে এটি প্রমাণিত হচ্ছে যে, এখানকার এ বৌদ্ধ বিহারটি একটি সমৃদ্ধ বৌদ্ধ বিহার হিসেবে গোটা পৃথিবীতে পরিচিত ছিল।

প্রাচীন বিক্রমপুরের ইতিহাসের লেখক শ্রী যোগেন্দ্রনাথ ১৯২৬ সালে বিক্রমপুরের ইতিহাসের বইয়ে অতীশ দীপংকরের বিষয়ে লেখতে গিয়ে নাটেশ্বর বিষয়ে লিখেন।
নাটেশ্বর দেউলের ১০ একর জমিতে ধারাবাহিকভাবে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে। আগামী ২ বছর পর্যন্ত এখানে খনন কাজ আরো চালানো হবে। তারপরে এগুলো সংরক্ষণের কাজ শুরু হবে। ইতোমধ্যে এখানে আরো চারটি ধাপে একাধিক প্রত্নতত্ত্ব আবিস্কার হয়েছে।

তা বালির বস্তা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। সকল খনন কাজ শেষ হলে এগুলো আবার সংরক্ষণের জন্য খুলে দেয়া হবে। এগুলো সংরক্ষণের জন্য এখানে যাতে পানি কোনভাবে প্রবেশ করতে না পারে তার ব্যবস্থা সবচেয়ে জরুরী হবে। এখানে প্রধানত শীত মৌসুমেই খনন কাজ শুরু করা হয়। বৃষ্টির জন্য গ্রীস্মকালে এখানে খনন কাজ বন্ধ থাকে। আর তাতে এখানে আবিস্কারের কাজ অনেকটা বিলম্ব ঘটে।

প্রাচীন বিক্রমপুরে ইতিহাসের অংশ হিসেবে এ জনপদ থেকে তাম্রলিপি, পাথর, ধাতব ও কাঠের বৌদ্ধ ও হিন্দু দেব দেবীদের মূর্তি ও ভাস্কার্য আবিস্কৃত হয়েছে। এগুলো বাংলাদেশের যাদুঘরসহ কলিকাতার যাদুঘর ও বিহারের যাদুঘরে শোভা পাচ্ছে।

এসব আবিস্কার প্রমান করে প্রাচীন বিক্রমপুর ছিল একটি ঐতিহ্য সমৃদ্ধ জনপদ। এর আগে এখানে কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। ২০১০ সালের দিকে অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন প্রথমে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান, খনন ও গবেষণার উদ্যোগ গ্রহণ করে।

অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের সভাপতি ড. নূহ উল আলম লেলিনের উদ্যোগে ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঐতিহ্য অন্বেষণের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান এ খনন কাজে অংশ নেন। এ কাজে আরো অংশ নেয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

রামপালের রঘুরামপুর এলাকায় ২০১০ সালে প্রত্নতত্ত্ব গবেষণায় অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন খনন কাজ শুরু করে। পরে এখানে বৌদ্ধ বিহার আবিস্কারসহ একাধিক প্রত্নতত্ত্ব আবিস্কার করেন তারা। বিক্রমপুর জনপদে ১০০০ বছরের মধ্যে এখানকার আবিস্কারের ঘটনা সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা। এরপর এখার খনন কাজ শেষে এটি এখন জনসাধরণের দেখার জন্য খুলে দেয়া হয়েছে।

এটি এখানকার মধ্যে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বড় ধরণের একটি সাফল্যে। বর্তমানে এখানে দূর দূরান্ত থেকে নানা বয়সী পর্যটকরা এখানে ছুটে আসেন।
গেল শনিবার নাটেশ্বর পরিদর্শনে আসেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ আবুল মনসুর, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ আবুল মনসুর, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) শ্রী রতন চন্দ্র পন্ডিত ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক রাখি রায়।

এ কাজটির সহযোগিতায় রয়েছেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। আর এখানকার কাজের আর্থিক সহযোগিতায় রয়েছেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
বৌদ্ধ ‘ধর্মচক্রে’ ৪.৬.৮.১২.২৪ এমনকি ৩১টি পর্যন্ত স্পোকযুক্ত থাকে। প্রতিটি স্পোকের বৌদ্ধ ধর্মে প্রতীকী অর্থে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করে। নাটেশ্বরে আবিস্কৃত অষ্টাকোণাকৃতির পঞ্চম স্তুপে আটটি স্পোকযুক্ত ‘ধর্মচক্র’ বৌদ্ধ ধর্মের মূল অষ্টাঙ্গিক মার্গ দর্শনকে দ্বিগুন করে প্রতিফলিত করে।

বৌদ্ধ ধর্মে কোন একক পূজনীয় হিসেবে ‘ধর্মচক্র’ প্রাচীন কাল থেকেই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়। বৌদ্ধ ধর্মে অষ্টম মঙ্গল হিসেবে ৮টি প্রতীক কল্পনা করা হয়। যার মধ্যে ‘ধর্মচক্র’ অন্যতম। ‘ধর্মচক্র’কে সূর্য রশ্নির সঙ্গে তুলনা করা হয়। অষ্টকোণা ও গোলাকার প্রতীকী স্থাপত্য। আট স্পোকযুক্ত ধর্মচক্র সবই বৌদ্ধ ধর্মের মূল মন্ত্রের প্রতীকী রূপ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here