আজ ১১ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাক হানাদার মুক্ত হয় মুন্সিগঞ্জ

আজ ১১ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাক হানাদার মুক্ত হয় মুন্সিগঞ্জ

গোলাম আশরাফ খান উজ্জ্বল, ১১ ডিসেম্বর ২০১৭, মুন্সিগঞ্জ নিউজ ডটকম: ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ থেকেই মুন্সিগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধারা পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ করতে থাকে।
কখনো মুন্সিরহাট, কখনো কেওয়ার, আবার টঙ্গীবাড়ি, আব্দুল্লাহাপুর, লৌহজং, শ্রীনগর, গজারিয়া ও সিরাজদিখান প্রভৃতি স্থানে যুদ্ধ করেছে মুক্তিযোদ্ধারা। কখনো স্থল যুদ্ধ আবার কখনো নৌযুদ্ধ। ১৯৭১ সালে মুন্সিগঞ্জ মহকুমা যুদ্ধকালিন সময়ে দু’ভাগে বিভক্ত ছিল।
মুন্সিগঞ্জ, গজারিয়া, টঙ্গীবাড়ি নিয়ে একটি এরিয়া শ্রীনগর, সিরাজদিখান ও লৌহজং নিয়ে একটি যুদ্ধ এরিয়া। প্রথম অংশের এরিয়া কমান্ডার ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ হোসেন বাবুল। দ্বিতীয় অংশের যুদ্ধকালিন কমান্ডার ছিলেন বীর মুক্তি যোদ্ধা শহিদুল আলম সাইদ।
আর মুন্সিগঞ্জ মহকুমার বিএলএফ প্রধান ছিলেন আনিসউজ্জামান আনিস। মুক্তিযুদ্ধের বহু মুক্তিযোদ্ধা দীর্ঘ নয় মাসে বিভিন্ন সময়ে হানাদারদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করেছেন।
এরা হলেন মোহাম্মদ কলিম উল্লাহ্, গোলাম মর্তুজা চৌধুরী রাজা, এনায়েত উল্লাহ খান সেন্টু, মিনআল ঢালী, মোহাম্মদ হানিফ মোল্লা, আনোয়ার হোসেন অনু, মোশারফ হোসেন সজল, আবু হানিফ, এডঃ মজিবুর রহমান, শামসুজ্জামান মানিক, মোফাজ্জল হক, কাজী আনোয়ার হোসেন, মোহাম্মদ আশা, মোহাম্মদ ইয়াদ আলী, খালেকুজ্জামান খোকা, আবুল কাশেম তারা মিয়া, টঙ্গীবাড়ির সামসুদ্দিন, বজলুর রহমান সেন্টু, আব্দুল হক, মহিউদ্দিন, মতিউল ইসলাম হিরু, মোহাম্মদ মাসুম, মোহাম্মদ খালেদ।
২৭ মার্চ ১৯৭১ সালে মুন্সিগঞ্জ ট্রেজারি লুট হয়। ট্রেজারির চারটি তালা ভেঙে মুন্সিগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধারা প্রায় ৩০০ টি অস্ত্র লুট করে। এতে নেতৃত্ব দেন আনিসউজ্জামান আনিস, খালেকুজ্জামান খোকা, মোহাম্মদ হোসেন বাবুল, এড. মুজিবুর রহমান ও আনোয়ার হোসেন অনু, ফজলু, খোরশেদ।
মুন্সিগঞ্জ সরকারি হরগঙ্গা কলেজ, কে, কে সরকারি ইনস্টিটিউট ও সোনালি ব্যাংকে ছিল পাক সেনাদের ক্যাম্প।
অন্য দিকে মুন্সিগঞ্জের বীর মুক্তিযোদ্ধারা রামপালের ধলাগাঁও, সুখবাসপুর ও বাঘিয়া এলাকায় ক্যাম্প স্থাপন করেন। সেখান থেকে তারা প্রতিরোধ ও আক্রমণ করা হয় সেদিন ছিল শব-ই-বরাত। রামপাল হাইস্কুল মাঠে সকল কমান্ডার ও মুক্তি যোদ্ধারা বীর মুক্তিযোদ্ধা আনিসউজ্জামান আনিস এর নেতৃত্বে মুন্সিগঞ্জ থানা আক্রমণ করেন।
রামপাল মাঠে একজন মাওলানা মুক্তি যোদ্ধাদের দোয়া ও মোনাজাত করেন। পরে ১০টি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে মুন্সিগঞ্জ থানা আক্রমণ করেন। অগ্রগামী গ্রুপ অজিত মোক্তারের বাড়ি থেকে একটি ফায়ার করে। ফায়ারটি করেন মোহাম্মদ হোসেন বাবুল। এর পর ১০টি গ্রুপ একসাথে ১০টি করে মোট ১০০টি ফায়ার করে।
পাক বাহিনীর বা পুলিশ কোন প্রতিরোধ করেনি। কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে শ্লোগান দেয় মুক্তিযোদ্ধারা। এরপর ২টি করে ১০ গ্রুপ হতে এক সাথে ফায়ার করা হয়। থানার কাছে গিয়ে মুক্তি যোদ্ধারা পুলিশকে সারেন্ডার করার কথা বলে।
মুন্সিগঞ্জ থানায় থাকা ১৭ জন পুলিশ আত্ম সমর্পণ করে। এ ১৭ জন পুলিশের মধ্যে ৩ জন ছিল মুক্তি যোদ্ধাদের ইন্ফরমার।
মুন্সিগঞ্জ থানা দখলের ৪৫ মিনিটের মধ্যে ধলেশ্বরী নদীতে টহলরত পাক বাহিনী সেল নিক্ষেপ করে, যার একটি শিলমন্দি মৃধাবাড়ির পাশে, অন্যটি রন্ছ মাদবর বাড়ি পাশে আঘাত হানে। অবশেষে মুক্ত হয় মুন্সিগঞ্জ।
এ সংবাদটি বিবিসিতে প্রেরণ করেন সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন। এছাড়াও উইং কমান্ডার হামিদুল্লাহ খান-বীর প্রতীক, বি এল এফ ঢাকার প্রধান মোঃ মহিউদ্দিন। মেহেরপুরে স্বাধীন বাংলা অস্থায়ী সরকারকে গার্ড অব অনার প্রদানকারি এসপি (অব) মাহবুব উদ্দিন বীর বিক্রম।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অঃষধং ড়ভ ইধহমষধফবংয ষরনবৎধঃরড়হ ডধৎ ১৯৭১ গ্রন্থে মুন্সীগঞ্জ জেলায় ১৩ টি যুদ্ধক্ষেত্রের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এই যুদ্ধক্ষেত্র গুলো হলো- ১. মুন্সীগঞ্জ পৌরসভা ২. মুক্তারপুর ৩. মুন্সিগঞ্জ লঞ্চঘাট ৪. পুরান বাউসিয়া ৫. চর বাউসিয়া ৬. নয়া নগর ৭. নয়া নগর (দ্বিতীয় দফা) ৮. গোসাইর চর ৯. ভাটের চর ১০. মুন্সিগঞ্জ থানা ১১. লৌহজং ১২. সিরাজদিখানের সৈয়দপুর ১৩. সিরাজদিখান থানা ।
এছাড়াও মুন্সিগঞ্জ সদরে আরো দুটি যুদ্ধক্ষেত্র রয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্র দুটো হলো- রতনপুর যুদ্ধক্ষেত্র ও মুন্সিরহাট যুদ্ধক্ষেত্র। মুক্তিযোদ্ধা মোঃ সুরুজ মিয়া, মুক্তিযোদ্ধা মোঃ বোরহান উদ্দিন জানান, রতনপুর যুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীকে মুক্তিবাহিনীরা পরাজিত করে। এ যুদ্ধে বীর মুক্তিযোদ্ধা এনামুল হক সরকার নেতৃত্ব দেন। প্রায় এক ঘন্টা স্থায়ী হয় রতনপুর য্দ্ধু। এ যুদ্ধের সময় ভারতীয় বিমান বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করে। সময়টা ছিলো ভোর রাত। মুন্সিরহাট যুদ্ধ হয় সকাল দশটায়। মুন্সিরহাটে অবস্থান নেয় পাক সেনাবাহিনী আর খালের দক্ষিণ পাড় চর কেওয়ারে বাইদ্দাবাড়ি এলাকায় অবস্থান নেয় মুক্তিবাহিনীরা। মর্টার সেল নিক্ষেপ করে পাক বাহিনী।
রাইফেল এর গুলি নিক্ষেপ করে মুক্তিবাহিনীরা। প্রায় এক ঘন্টা স্থায়ী হয় এই য্দ্ধু। যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী জয় লাভ করে। এ যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর পক্ষে কেওয়ার গ্রামের সাহসী সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা মিন আল ঢালী। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডেটাসোর্স অনুযায়ী জেলায় ছয়টি বদ্ধভূমি বা সমাধি ভূমি রয়েছে। বদ্ধভূমি গুলো হলো-১. কেওয়ার সাতানিখিল ২. হরগঙ্গা কলেজ হোস্টেল ৩. হরগঙ্গা কলেজ সংলগ্ন পাঁচঘড়িয়াকান্দি ৪. চর বাউসিয়া ৫. নয়া নগর ৬. সৈয়দপুর। এছাড়াও আব্দুল্লাপুরের পালবাড়িতে একটি বদ্ধভুমি রয়েছে। জেলায় ৬৭ টি শহিদ পরিবার রয়েছে। শাখাওয়াত হোসেন নিলু জানান, ১১ ডিসেম্বর সকালে এড. শহীদুল আলম সাঈদ গ্রুপের সহযোগি মুক্তিযোদ্ধারা সকালে মুন্সীগঞ্জ শহর দখল নেয়। বীর মুক্তিযোদ্ধা এড. মুজিবুর রহমান জানান, বেলা ১১ টার সময় তিনি ও তার সহ মুক্তিযোদ্ধারা মুন্সিগঞ্জ শহরে অবস্থান নেয়। তারিখটি ছিলো ১১ ডিসেম্বর ১৯৭১।
২৪৪৪ জন মুক্তিযোদ্ধা নয় মাস যুদ্ধ করে ১১ ডিসেম্বর ১৯৭১ সনে মুন্সিগঞ্জকে শত্রুমুক্ত করে। ২০০৭ সালের ২৭ জুন বাংলাদেশের মহামন্য রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ড. ইয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নাম সংম্বলিত স্মৃতিফলক উন্মোচন করেন। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে।
১১ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাক হানাদার মুক্ত হয় মুন্সিগঞ্জ। অর্থাৎ ১১ ডিসেম্বর বাংলাদেশের অন্যান্য অংশের মতো মুন্সিগঞ্জ মুক্ত স্বাধীন হয়। মুন্সিগঞ্জ তখন মহকুমা। জাতি তাদের বিন¤্র শ্রদ্ধায় স্বরণ করবে আজীবন।

তথ্য: অঃষধং ড়ভ ইধহমষধফবংয ষরনবৎধঃরড়হ ডধৎ ১৯৭১
বীর মুুক্তিযোদ্ধা এম.এ. কাদের মোল্লা-সদর থানার কমন্ডার, মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট।
বীর মুুক্তিযোদ্ধা শহীদ হোসেন- ডেপুটি ইউনিট কমান্ডার, সদর থানার কমন্ডার, মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট।
বীর মুুক্তিযোদ্ধা মোঃ আশা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here