মুন্সিগঞ্জের কেওয়ার গ্রামে বার আউলিয়ার মাজার (ভিডিওসহ)

1434033949

মোহাম্মদ সেলিম, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, মুন্সিগঞ্জ নিউজ ডটকম: ইসলাম ধর্মের প্রথম যুগে সূদূর আরব দেশ থেকে একাধিক সূফী দরবেশ ও ইসলাম ধর্মের সাধক পবিত্র ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য সেই সময়ের বঙ্গের রাজধানী বিক্রমপুর পরগনায় আসেন।

মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার মহাকালী ইউনিয়নের কেওয়ার গ্রামে সেই সময়ের আলোচিত সূফী দরবেশ ও পবিত্র ইসলাম ধর্মের সাধকদের সর্ম্পকে একটি প্রাচীন শিলালিপি পাওয়া যায়।
সেই শিলালিপির সূত্রে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, প্রাচীন বিক্রমপুর তথা বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলায় হিজরী ৪২১ সনে ৯৭৮ খ্রি: সুদূর আরব দেশ থেকে পবিত্র ইসলাম ধর্ম প্রচার করার জন্য মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এর আনসার ও মুজাহিদ হিসেবে আউলিয়াগণরা বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জের কেওয়ার গ্রামে আগমন করেন।

এক সময়ে এই স্থানটিতেই কালীদাস সাগর প্রবাহিত হতো বলে জনশ্রুতি রয়েছে। পরবর্তীতে এই স্থানটিতে বড় বড় চর পড়ে জঙ্গলাপূর্ণ পতিত ভূমিতে পরিণত হয়। তারপর থেকেই এখানে ধীরে ধীরে জনবসতি গড়ে উঠতে থাকে।
ইসলাম ধর্মের প্রথম যুগে সূদূর আরব দেশ থেকে ১২ জন আউলিয়া এই স্থানটিতে আসেন এবং তারা পবিত্র ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য এই জনপদের এখানেই অবস্থান নেন।
পরে দ্বীন ইসলাম প্রচারের কেন্দ্র হিসাবে বিক্রমপুর পরগনায় বিভিন্ন স্থানে ইমারত, খাবর পানি ও ব্যবহারের জন্য দীঘি খনন ও এবাদতখানা প্রতিষ্টা করেন। পরে সেখানেই তারা ওফাৎ গ্রহণ করেন।
১৯৭৪ সালে কেওয়ার গ্রামের তেতুলতলা নামক স্থানে এখানকার লোকজন মাজারের সংস্কার কাজ শুরু করেন। এখানে পর্যায়ক্রমে সারিসারি তিনটি মাজার এখনো বিদ্ধমান রয়েছে।
সংস্কারের সময় ভগ্ন একটি মাজারের পাশ থেকে এক খন্ড পাথরের আরবী ও ফার্সী ভাষার লিখিত শিলালিপি পায় এলাকাবাসী। সেই শিলালিপিতে লেখা ১২ সূফী দরবেশ বা ইসলাম ধর্ম প্রচারকের নাম তখন পাওয়া যায়।
এতে সেই সময় এলাকাবাসী জানতে পারেন এই বারোজন আউলিয়ার নাম। আর তখন থেকেই এই বারো আউলিয়ার নামে এলাকাটি প্রচার ও প্রসার ঘটে বলে এলাকাবাসী মনে করেন।
কলেমা তায়্যিবা খচিত ও ৪২১ হিজরী শিলালিপিতে স্পষ্টক্ষরে লেখা রয়েছে। পর্যায়ক্রমে ১২ জন অলি বা দরবেশের নাম পাথরটিতে উল্লেখ রয়েছে।majar12a

তৎকালীন শ্রীনাথ গুপ্তের রাজত্বকালে এই অলিরা এখানে এসে ইসলাম প্রচার করেন। অর্থাৎ মুন্সিগঞ্জের কেওয়ার তেতুলতলা গ্রামে এসে তাঁরা বসতী স্থাপন করেন। মাজারের শিলালিপিতে আরো উল্লেখ রয়েছে, আরবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ইসলাম প্রচারে মুন্সিগঞ্জের কেওয়ার গ্রামে এসে তাঁরা বসতী স্থাপন করেন।
মাজারের শিলালিপি অনুসারে ১২ জন অলির নাম হচ্ছে, শাহ সুলতান হোসাইনী (রহঃ)। তিনি মদিনা থেকে এসেছেন। সুলতান সাব্বির হোসাইন (রহঃ), কবীর হাসিমি (রহঃ), আল হাসান (রহঃ), শেখ হোসাইন (রহঃ), আবুল হাসেম হোসাইনী (রহঃ), হাফেজ আবু বক্কর সিদ্দিক (রহঃ), হযরত ইয়াছিন (রহঃ), ওবায়েদ ইবনে মুসলিম আসাদী (রহঃ), আব্দুল হালিম (রহঃ), শাহদাৎ হোসাইনী (রহঃ) এবং আবুল কাহার আল বাগদাদী (রহঃ)। তিনি ইরাকের বাগদাদ থেকে এসেছেন বলে অনুমান করা হচ্ছে।
তারা মুন্সিগঞ্জ জেলা সদরের স্বরসতী, কেওয়ার, মহাকালী, বজ্রযোগিনী, চম্পাতলা গ্রামে পবিত্র ইসলাম ধর্মের প্রসার ঘটান। পরে তারা মুন্সিগঞ্জ জেলার বাহিরের রাজবাড়ী, শ্রীপুর, কার্তিকপুরে পবিত্র ইসলাম ধর্ম প্রচার করেন সেই সময়ে।
কেওয়ার এলাকার পানির অভাব দূরীকরণে সেই সময় আউলিয়াগণরা এখানে একাধিক দীঘি খনন করেন। সেই সময়ের দিঘীগুলো এখনো এখানে বিদ্যমান রয়েছে।
১৯৭৪ সালের পর থেকে কেওয়ারের তেতুলতলা মাজার বার আউলিয়ার মাজার হিসাবে মুন্সিগঞ্জ জেলাসহ সারাদেশে পরিচিতি লাভ করেছে।

কিভাবে এখানে যাওয়া যায়
রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী জেলা হচ্ছে মুন্সিগঞ্জ। মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার মহাকালী ইউনিয়নের কেওয়ার গ্রামে বার আউলিয়ার মাজারটি অবস্থিত।
সড়কপথে ঢাকা থেকে মুন্সিগঞ্জের দূরত্ব মাত্র ২৩ কিলোমিটার। তবে এই মাজারে আসার জন্য মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলা থেকে আরো প্রায় ৯ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের মহাকালি ইউনিয়নের কেওয়ার গ্রামে আসতে হবে।
ঢাকা থেকে সকালে এসে মাজার জিয়ারত করে বিকেলেই আবার ঢাকায় ফিরে যাওয়া যায়। সড়কপথটি পিচঢালা। তবে নৌপথে গেলে সময়ও বাঁচবে এবং যানজট এড়িয়ে নদী পথের সৌন্দর্য গ্রহণ করে স্বাচ্ছন্দের সাথে পৌঁছানো ও ফিরে যাওয়া যায়।
ঢাকার সদর ঘাটের শ্যামবাজারের কাছে নতুন লঞ্চ টার্মিনাল থেকে প্রতি ঘন্টায় চাঁদপুরগামী যে লঞ্চগুলো ছাড়ে তা মুন্সিগঞ্জ লঞ্চঘাট হয়েই যায়। এই লঞ্চগুলো প্রায় দেড় ঘন্টার মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যাবে মুন্সিগঞ্জ লঞ্চ ঘাটে।
মুন্সিগঞ্জ শহরের লঞ্চঘাট থেকে কেওয়ার গ্রামে বার আউলিয়ার মাজারের রিক্সা ভাড়া ৭০-৮০ টাকা। তবে গাড়ি নিয়েও যাওয়া যায়। আবার মুন্সিগঞ্জ শহরের লঞ্চঘাট থেকে রিক্সায় ১০ টাকায় মুন্সিগঞ্জ জেলা শিল্পকলার সামনে নামতে হবে। এখানে প্রায় ৭ মিনিটে হেটেও যাওয়া যায়।
মুন্সিগঞ্জ জেলা শিল্পকলার কাছ থেকে ১০ টাকায় ইজিবাইকে লোহারপুল নামতে হবে। সেখান থেকে ১০টায় রিক্সায় তেতুলতলার বার আউলিয়ার বাজারে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায়।
ঢাকার গুলিস্তানের সামনে থেকে দীঘিরপাড় টান্সপোর্ট লি: নামে বাসে ৬০ টাকায় মুন্সিগঞ্জ আসা যায়। পরে জেলা শিল্পকলার কাছ থেকে ইজিবাইকে লোহারপুল থেকে রিক্সায় তেতুলতলার বার আউলিয়ার বাজারে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায়।
উল্লেখ, দীঘিরপাড় টান্সপোর্ট লি: নামের বাসটি মুন্সিগঞ্জ জেলা শহরে ও টঙ্গীবাড়ী উপজেলার দীঘিরপাড় ইউনিয়নে যাতায়াত করে। তাই এই বাসে উঠার সময় মুন্সিগঞ্জ যাবেন এই কথাটি বলতে হবে। তা না হলে আবার ঘুন্নি পথে পড়তে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here