শাহজাহান বাচ্চুকে গুলি করে হত্যার প্রতিবাদে মুন্সিগঞ্জে মানববন্ধন: সিরাজদিখান থানায় মামলা দায়ের

 শুভ ঘোষ, মঙ্গলবার, ১২ জুন ২০১৮, মুন্সিগঞ্জ নিউজ ডটকম:

Photo bacchu hotta (1)

মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার পূর্ব কাকালদি গ্রামে বিশাকা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী মুক্তমনা লেখক ও সাংবাদিক শাহজাহান বাচ্চুকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যার ঘটনায় নিহতের দ্বিতীয় স্ত্রী আফসানা বেগম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ৪ জনকে আসামী করে মঙ্গলবার সিরাজদিখান থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।

ধর্মীয় উগ্রবাদ ও পারিবারিক কলহকে প্রাধান্য দিয়ে হত্যার সূত্র খোঁজার জন্য কাজ শুরু করেছে পুলিশ। এদিকে এই হত্যার প্রতিবাদে দুপুর ১২টার দিকে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সোমবার সন্ধ্যায় জেলার সিরাজদিখান উপজেলার পূর্ব কাকালদি গ্রামে মুন্সিগঞ্জ- শ্রীনগর সড়কের তিন রাস্তার মোড়ে দুর্বৃত্তরা গুলি করে হত্যা করে বিশাকা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ও সাংবাদিক শাহজাহান বাচ্চুকে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ইফতারের ঠিক

আগ মুহুর্তে কাকালদি গ্রামে মুন্সিগঞ্জ- শ্রীনগর সড়কের তিন রাস্তার মোড়ে একটি ফার্মেসিতে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন তিনি। এই সময় দুটি মোটরসাইকেলে চারজন দূর্বৃত্ত এসে তাকে দোকান থেকে টেনে হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে আসে।

এই সময় দূর্বৃত্তরা কয়েকটি হাতবোমা ফাটিয়ে ঘটনা স্থলে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। পরে দূর্বৃত্তরা শাহজাহান বাচ্চুর বুকে পরপর দুটি গুলি করে দ্রুত ঘটনা স্থল থেকে পালিয়ে যায়।
এ ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে পাঠায়।

পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শাহজাহান বাচ্চু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালিখি করতেন এ কারণে ধর্মীয় উগ্রবাদীরা কয়েক দফা হত্যার হুমকি দিয়েছে তাকে।

shajahan-bacchu1-20180611213917

এদিকে ঘটনার পর খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে কাউনটার টেররিজম ইউনিটের সদস্যরা।
মুন্সিগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম পিপিএম জানান, এই ঘটনায় নিহতের দ্বিতীয় স্ত্রী আফসানা বেগম বাদী হয়ে

অজ্ঞাতনামা ৪ জনকে আসামী করে সিরাজদিখান থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। ধর্মীয় উগ্রবাদ ও পারিবারিক কলহকে প্রাধান্য দিয়ে ইতি মধ্যে হত্যার সূত্র খোঁজার জন্য কাজ শুরু করেছে পুলিশ।

এ প্রসঙ্গে নিহতের ছেলে ও মেয়ে দূর্বা আর আচঁল জাহান বলেন, আমার বাবা শাহজাহান বাচ্চু মরে গেছে। আমাদের গ্রামে। বাবাকে কারা যেন দুইটা গুলি করে মেরে ফেলেছে। লেখক, প্রকাশক ও বাম নেতা শাহজাহান বাচ্চুকে (৬৫) হত্যার পর তার মেয়ে দূর্বা জাহান ফেসবুকে এমন পোস্ট দেন।

সেখানে অনেকে মন্তব্য করেছেন- এ খবর তারা বিশ্বাস করতে পারছেন না। এমন হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। অনেকে তার পরিবারকে ধৈর্য ধরতে পরামর্শ দেন।

নিহত লেখক শাহজাহান বাচ্চু সিরাজদিখানের কাকালদী গ্রামের মরহুম মমতাজউদ্দিনের ছেলে। তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মুন্সিগঞ্জ জেলার সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ঢাকার বাংলাবাজার এলাকার ‘বিশাকা প্রকাশনী’র স্বত্বাধিকারী ছিলেন তিনি। প্রকাশকের পাশাপাশি শাহজাহান বাচ্চু একজন লেখক, কবি, সাংবাদিক, ব্লগার ও সংগঠক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

এ ছাড়াও ঢাকা থেকে ছাড়পত্র প্রাপ্ত ‘আমাদের বিক্রমপুর’ নামে পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকও ছিলেন শাহজাহান। তার বেশ কয়েকটি কবিতার বই রয়েছে। কে বা কারা এবং কী কারণে গুলি করে হত্যা করেছে তাকে, তা তাৎক্ষণিক পুলিশ ও পরিবার জানাতে পারেনি।

হত্যার কারণ উদঘাটনে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। তবে প্রাথমিক আলামত দেখে পুলিশের ধারণা- এ হামলার সঙ্গে জঙ্গিরা জড়িত থাকতে পারে। এরই মধ্যে ঘটনাস্থল থেকে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) ও বোমা নিষ্ফ্ক্রিয়করণ দলের সদস্যরা ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) উদ্ধার করেছে।

এ ধরণের ডিভাইস সাধারণত উগ্রপন্থিরা ব্যবহার করে বলে জানায় পুলিশ। তাই তাদের প্রাথমিক অনুমান, এটি জঙ্গি হামলা। তবে শতভাগ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত হামলার অন্য উদ্দেশ্যও উড়িয়ে দিচ্ছে না পুলিশ। সংশ্নিষ্ট একাধিক উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা গতকাল সোমবার রাতে এসব তথ্য জানান।

নিহত শাহজাহানের দুই স্ত্রী, এক ছেলে ও তিন মেয়ে। প্রথম স্ত্রী লুৎফা আক্তার কাননী নারায়ণগঞ্জে সমাজসেবা অফিসে কর্মরত রয়েছেন, তিনি সেখানে বসবাস করেন। তার দুই মেয়ের মধ্যে বিপাশা বিবাহিত ও আরেক মেয়ে দূর্বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্রী। দ্বিতীয় স্ত্রী আফসানা বেগমের মেয়ে শাম্মী জাহান আঁচল ও ছেলে বিশাল জাহান। আফসানা গ্রামে থাকেন। শাহজাহান কখনও ঢাকা ও আবার কখনও সিরাজদিখানে থাকতেন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে পূর্ব কাকালদী (মুন্সিগঞ্জ-শ্রীনগর সড়কের) তিন রাস্তার মোড়ে আনোয়ার হোসেনের আনুর ফার্মেসির সামনে বসে কথা বলছিলেন শাহজাহান বাচ্চু। এ সময় দুটি মোটরসাইকেলে চার ব্যক্তি এসে তাকে জোর করে টেনেহিচড়ে দোকানের বাইরে নিয়ে যায়। তাদের মধ্যে তিনজন হেলমেট পরিহিত ছিল।

এ সময় অন্যদের তারা সরে যেতে বলে। এর পরই হাত বোমা ফাটিয়ে আতঙ্ক তৈরি করে মোটর সাইকেল আরোহীরা। এক পর্যায়ে শাহজাহান বাচ্চুকে তার বুকের ডান পাশে দুইটি গুলি করে। ঘটনার সময় সিরাজদিখান থানার এএসআই মাসুম ওই রাস্তা দিয়ে জেলা সদর থেকে সিরাজদিখান থানার দিকে যাচ্ছিলেন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ফরিদ আহমেদ বলেন, বিশাকা থেকে কবিতার বই বেশি বের হতো। অনেক দিন ধরে বিকাশার কর্ণধার শাহজাহানের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ নেই। তিনি এই সংগঠনের সদস্য নন।

শাহজানের ঘনিষ্ঠ কবি মুজিব রহমান জানান, শাহজাহান তাকে বিভিন্ন সময় জানিয়েছেন মৌলবাদীদের হিটলিস্টে তার নাম রয়েছে। এ থেকে তার ধারণা, উগ্রবাদীরা তাকে খুন করেছে।

প্রত্যক্ষদর্শী এএসআই মাসুম জানান, ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই একটি বিকট আওয়াজ তিনি পান, সামনে এসে দেখেন একটি লোক পড়ে আছে। প্রথম ভাবছিলেন বিদ্যুতের তারে সমস্যা হয়েছে কি-না। পাশের রাস্তা থেকে তাকে উদ্দেশ করে বলছে, ‘শালাকেও গুলি কর।’ এমন সময় একজন ব্যাগ থেকে একটি ককটেল ছুড়ে তার দিকে দৌড়ে আসে। মাসুম পিস্তল বের করতেই

আরেকজন তাকে উদ্দেশ্য করে গুলি ছোড়ে। এমন পরিস্থিতিতে তিনি বসে গুলি করার চেষ্টা করলে বিপরীত রাস্তা ধরে চার দূর্বৃত্ত মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়।

জানা গেছে, ঘটনার পরপরই সিসিটিসির সদস্যরা সিরাজদিখানে যান। ঘটনাস্থলে বিস্ফোরিত বোমার আলামত দেখে পুলিশের ধারণা, এর সঙ্গে উগ্রপন্থিরা সম্পৃক্ত থাকতে পারে। ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন ও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

সিরাজদিখান থানার ওসি মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, ঘটনার পর থেকে ঘটনাস্থলে অবস্থান করে হত্যাকা-ের কারণ উদ্ঘাটনের লক্ষ্যে তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ। তবে কী কারণে এবং কারা তাকে গুলি করে হত্যা করেছে, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফেসবুকে আকাশ ইকবাল নামে একজন পোস্ট দেন- ‘শাহজাহান বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় তিন বছরের। তিনি অসাধারণ একজন লেখক ও মানুষ। কে বা কারা তাকে গুলি করে হত্যা করেছে। অথচ তিনি আমাকে সব সময় সাবধান করতেন। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে কখনও ভাবেননি।’

স্থানীয় অপর একজন ফেসবুকে সিদ্ধার্থ তপু লেখেন- ‘শাহজাহান কোরআন ও হাদিসের বিজ্ঞান ও যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা করতেন। এটাই তার অপরাধ ছিল। এসব নিয়ে মৌলবাদীদের হুমকি-ধমকির পরে একজন ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী বেশ কিছু দিন তার পাশে রাখতে বাধ্য হন তিনি।’

জানা গেছে, শাহজাহানের প্রকাশনা সংস্থা থেকে নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহার মতো প্রখ্যাত কবিদের কাব্যগ্রন্থ বের হতো। প্রকাশক হিসেবে সজ্জন ছিলেন বাচ্চু। ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত তিনি জাপানে ছিলেন। এরপর দেশে ফিরে প্রকাশনা সংস্থা খোলেন। এখন পর্যন্ত তার প্রকাশনা সংস্থা থেকে ছয় শতাধিক বই বেরিয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে তিনি ফেসবুকে সক্রিয় হন। ২০১৩ সালে দেশে

ব্লগার হত্যা শুরু হলে ফেসবুকে এর নিন্দা জানাতে শুরু করেন তিনি, এর জন্য বিভিন্ন সময় তাকে হত্যার হুমকি ও দেওয়া হয়েছে।

২০১৩ সাল থেকে শুরু করে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় উগ্রপন্থি জঙ্গিদের হাতে একের পর এক ব্লগার, মুক্তমনা লেখক ও অনলাইনে সক্রিয় ভিন্নমতের বেশ কয়েকজন হত্যার শিকার হন। এর মধ্যে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় খুন হন বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায়। একই বছরের

অক্টোবরে শাহবাগের আজিজ মার্কেটে নিজের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে জঙ্গিরা খুন করে জাগৃতি প্রকাশনীর মালিক ফয়সল আরেফিন দীপনকে। একই দিন লালমাটিয়ায় নিজের কার্যালয়ে ঢুকে জঙ্গিরা প্রকাশনা সংস্থা শুদ্ধস্বরের স্বত্বাধিকারী আহমেদুর রশীদ টুটুলকে হত্যাচেষ্টা চালায়। একইভাবে ব্লগার নীলাদ্রি নিলয়, অনন্ত বিজয় দাশ ও ওয়াশিকুর বাবুকে একই কায়দায় কুপিয়ে হত্যা করে

জঙ্গিরা। একের পর এক এমন টার্গেট কিলিংয়ের পর দেশজুড়ে সক্রিয় হয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিভিন্ন অভিযানে নিহত হতে থাকে জঙ্গিরা। অনেক জঙ্গি ধরাও পড়ে। তবে প্রকাশক দীপন হত্যার তিন বছরের মাথায় আরেক প্রকাশক শাহজাহান

বাচ্চু প্রায় একই কায়দায় হত্যাকা-ের শিকার হলেন। এর আগেও বিভিন্ন জায়গায় এই আদলে টার্গেট করা ব্যক্তিকে হত্যা করেছে নব্য জেএমবি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here