বাংলা সাহিত্য কারবালা

গোলাম আশরাফ খান উজ্জ্বল, রোববার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, মুন্সিগঞ্জ নিউজ ডটকম:

কারবালা ইরাকের একটি শহর। এটি ফোরাত নদীর তীরে। এটি একটি ঐতিহাসিক শহর। এ শহরে ঘটে ছিলো ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যা কান্ড, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর মেয়ের ঘরের নাতি, হযরত আলী (রা:) ও হযরত ফাতিমার (রা:) নয়নের মনি হযরত হোসাইন (রা:) এজিদ বা ইয়াজিদ বাহিনীর সীমার কর্তৃক শাহাদাৎ বরণ করেন।

সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য স্বল্পসংখ্যক পারিবারিক লোক নিয়ে যুদ্ধে অবর্তীণ হয়ে হোসাইন (রা:) শহীদ হন। কারবালার বিষয়কে উপজিব্য করে বিশ্বের মুসলিম দেশ গুলোতে অনেক সাহিত্য রচনা হয়েছে। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নেই। হিজরি ৬১ সালের ১০ মহরম কারবালায় এ হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘটেছিল। যা নিয়ে রচিত হয়েছে অসংখ্য সাহিত্য।

বাংলা সাহিত্যে কারবালার হৃদয় বিদারক বিবরণ নিয়ে বাংলা পুথি সাহিত্য হয়েছে। হয়েছে বিষাদ সিন্দুর মতো ঐতিহাসিক উপন্যাস। মোহররম কবিতা, গজল ও ইসলামি সংগীত। বাংলা ইসলামি কবিতায় এরকম একটি চরণ রয়েছে ‘‘নবীর নাতি হোসাইন দশই মহররমের দিন/ধর্মের নামে শহীদ হলেন কারবালার ময়দান।’’ কবি এখানে হোসাইন (রা:) কে ধর্ম যুদ্ধে শহীদ দেখিয়েছেন। এখানে হোসাইন (রা:) সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য ফোরাতের তীরে নিজের জীবন উৎসর্গ করে ইতিহাসে অমর হয়ে রইলেন। তাই তো তাঁকে নিয়ে কাসিদা, ইসলামি সংগীত, গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, কবিতাও ইতিহাস রচিত হচ্ছে।

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মোহররমের হৃদয় বিদারক ঘটনাকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। তার বিখ্যাত একটি কবিতার নাম হলো ‘‘মোহররম’’। এই মোহররম কবিতায় কবি কাব্যঢংএ কারবালার দৃশ্য ফুটিয়ে তুলেছেন। যা পাঠক হৃদয়ে বেদনা বিধুর ভাব সৃষ্টি করে। এখানে আমাদের প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘‘মোহররম’’ কবিতার কয়েকটি চরণ তুলে ধরা হল। ‘‘নীল সিয়া আসমান, লালে লাল দুনিয়া/‘‘আম্মা! লা’ল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া//’’ কাঁদে কোন ক্রদসী কারবালা ফোরাতে// সে কাদনে আঁসু আনে সীমারেরও ছোরাতে//’’ রুদ মাতম ওঠে দুনিয়া দামেশকে/জয়নালে পারলো এ খুনিয়ারা বেশ কে/হায় হায় হোসেনা ওঠে বোল ঝঞ্চায়/তলওয়ার কেঁপে ওঠে এজিদেরো পাঞ্জায়//উম্মাদ দুলদুল ছুটে ফেরে মদিনায়/আলিজাদা হোসেনের দেখা হেথা যদি পায়।’’ এখানে কবি নজরুল হযরত আলী (রা:) ও মা ফাতেমার প্রিয় দুলাল হোসেন (রা:) কারবালা ময়দানে এজিদ বা ইয়াজিদ সেনাপতি কুচক্রি সীমার কর্তৃক শাহাদাৎ হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
কারবালা যুদ্ধ একটি নিছক যুদ্ধ নয়। ইয়াজিদের বিরুদ্ধে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর দৌহিত্র হযরত হোসাইন (রা:) সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। ইসলামে যে সত্য ও ন্যায়ের মহিমার কথা বারবার বলা হয়েছে। তা ভুলোগিয়ে এজিদ জোর জুলুম আর নারীদের অত্যাচারের খরগ সৃষ্টি করে। এরই বিরুদ্ধে পরিবারের গুটি কতক সদস্য নিয়ে সত্যের পক্ষে যুদ্ধ ঝাপিয়ে পড়েন হযরত হোসাইন (রা:)। এ যুদ্ধে হোসাইন পরিবারের পুরুষ, শিশু ও নারী অংশ গ্রহণ করে শহীদ হন।

কারবালার যুদ্ধকে বিষয়বস্তু করে বাংলা সাহিত্যের আরো একটি বিখ্যাত উপন্যাস বিষদ সিন্ধু। মীর মোশাররফ হোসেনের লেখা বিষাদ সিন্ধু পাঠ করে আবেগ তারিত হয়নি এমন মুসলমান বাঙালির সংখ্যা খুঁজে পাওয়া যায়না। এ উপন্যাসে ময়মুনা নামক এক নারীর কুটবুদ্ধিতে ইমাম হাসান ও হোসেনের বংশ ধংস হয়। পাষন্ড সীমার, এজিদ, মারওয়ান বিষাদ সিন্ধুর সবচেয়ে খারাপ চরিত্র। এখানে মীর মোশাররফ হোসেনের বিষাদ সিন্ধু উপন্যাস থেকে কয়েকটি লাইন তুলে ধরা হলো-হোসেন বলিতে লাগিলেন ‘‘ভাই সকল এজিদের জীবনের প্রথম কার্যই আমাদের বংশ বিনাশ করা। যে উপায়ে হউক এজিদ আমার প্রাণ বিনাশ করিবে।’’ এ উক্তিটি বিষাদ সিন্ধু উপন্যাসের দ্বাবিংশ প্রবাহে দেখানো হয়েছে।

পাঞ্চবিংশ প্রবাহে দেখানো হয়েছে একটি করুন চিত্র। সেখানে কাসেম নবাবিবাহিত। স্ত্রীর সাথে বাসর না করেই কারবালা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। যুদ্ধে কাসেম শহিদ হন। এখানে উপন্যাসিক চরিত্রটিকে মর্মস্পর্শী করে চিত্রন করলেন। ‘‘কাসেমের চক্ষু একেবারেই বন্ধ হইলো। ….সখিনা স্বামীর মৃত দেহ অঙে ধারণ করিয়া করুন স্বরে বলিতে লাগিলেন, কাসেম একবার চাহিয়া দেখ, তোমার সখিনা এখনো সেই বিবাহ বেশ পরিয়া রহিয়াছে। কেশ গুচ্ছ যে ভাবে দেখিয়াছিলে এখনো সেই ভাবে রহিয়াছে।’’ এখানে কারবালার একটি করুন দৃশ্য চিত্রায়ন করা হয়েছে।

সবচেয়ে করুন ও হৃদয় বিদারক দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে ষড়বিংশ প্রবাহে। মীর মোশাররফ হোসেন কারবালার সবচেয়ে ট্রেজেডিক দৃশ্যটি এভাবে বর্ণনা করেছেন, ‘‘কিছু দূর যাইয়া হোসেন আকাশ পানে দুই তিনবার চাহিয়া ভূতলে পড়িয়া গেলেন।…..হোসেন আর নাই্ চল হোসেনের মস্তক কাটিয়া আনি। …..সীমার তীর বিদ্ধস্থানে খঞ্জর স্পর্শ করিল। অমনি হোসেনের শির দেহ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া গেল।’’ এভাবেই তিনি হোসেনের শহীদ হওয়ার বর্ণনা করেছেন।

মোহররম মাস এলে গ্রাম বাঙলার মুসলিম নারীরা মাথায় একমাস তেল ব্যবহার করেন না। বিশেষ করে শিয়া মুসলমানরা এ নিয়ম বেশী পালন করে। তারা পোশাক আসাকে শৈথল্য দেখায়। বাংলাদেশের অনেক স্থানে ১০ মোহররম তারিখে তাজিয়া শোক মিছিল হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনায় এসকল মর্সিয়া মিছিল হয়। গ্রাম বাংলায় মাজার দরগাহ ও খানকায় তিনচারজনে মিলে কোরাস গায়। ‘‘মোহররমের দশ তারিখে কী ঘটাইলেন রাব্বানা/কলিজা ফাটিয়া যায় গো কহিতে তার ঘটনা/ হাসান মইলো যহর খাইয়া/হোসেন শহীদ কারবালায়//জয়নাল আবদীন বন্ধিগো হইলো/এজিদেরই জেল খানায়//এটি গেয়ে গেয়ে চাল, ডাল, টাকা তোলে। দশ মোহররম তারা শিরনি, খিচুরী করে। এ ফতেহা করার আগে মিলাদ, দরুদ শরীফ পড়ে নবী বংশ ও ইমাম বংশের জন্য দোয়া করা হয়। এ রীতিটি বাংলা সাহিত্য সাংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে শত শত বছর ধরে//

[লেখক-প্রাবন্ধিক]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here