বিক্রমপুরে নদী ভাঙন-দূর্ভিক্ষ

১৮৯০-১৮৯৮ সময়কালে বিক্রমপুরের সাবেক দীঘলি বন্দরের (বর্তমান লৌহজং উপজেলা) এক কি:মি দক্ষিনে পূর্বপুরুষের পাইনপাড়া গ্রামটি পদ্মা নদীতে ভেঙে গেলে আমাদের অভিজাত গৃহস্থ পরিবার ও নিকটজন

শ্রীনগর ও লৌহজং এর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েন। বাবার দাদা বেঙ্গু খাঁ উত্তর কোলাপাড়ার দুখাই হাজী বাড়ির কাছে তাঁর নিকটজন সি.এস রেকর্ডের মালিক গোলাপ খাঁর বাড়ি (বর্তমান ভাগ্নে শহীদুলদের বাড়ি) এসে উঠেন,

আমাদের তিন দাদার জন্ম ওখানেই। পিতা মোহন খানের ১৯২৮ সালে আসাম যাবার প্রায় ৩০ বছর আগে থেকেই দাদা আদালত খান এবং দাদু আরজুদা বেগম এর নিকটজনসহ গ্রামের ও বিক্রমপুরের অন্যান্য এলাকা

থেকে আসাম যাবার প্রবণতা ছিল, ১৯৩০-১৯৪৭ সময়কালে লোকজনের আসাম যাবার ঢল নেমেছিল। একজন গেলে পরিবারের বা গ্রামবাসী ধরাধরি করে আসাম চলে যেতেন, যেমনটা পরবর্তীতে দেখেছিলাম বিদেশ যাবার ও গার্মেন্টস এর চাকুরির ক্ষেত্রেও।

রাড়িখালের মাইনুদ্দিন খলিফা দেশে এসে ডেকে ডেকে লোকজনকে আসাম নিয়ে যেতেন, ভারতবর্ষে আসাম যেতে আসতে এক টিকেটে স্টীমার/রেলে চড়ে এদিকে গোয়ালন্দ-পার্বতীপুর- লালমনিরহাট হয়ে আসাম রুট ছিল, অপর দিকে মৌলভীবাজারের লাতু দিয়ে আরেকটি রুট ছিল। আপার আসামের শিবসাগরে পিতার ব্যবসা

কেন্দ্র মরানহাট যেতে ১দিন ১রাত পাড়ি দিয়ে কাছাকাছি শিমুলগুড়ি রেল জংশনে নেমে আরেক রেলে মরানহাট যেতে হত। ১৯৪৭ এর পরে করিমগঞ্জ হয়ে লামডিং ফরকাটিং জংশন হয়ে যাওয়া আসার পথে ৩৬টি পাহাড়ের গুহা (স্থানীয় ভাষায় বুগদা)

ডিঙ্গিয়ে যেতে হত, ৭টি বড় গুহায় ঢুকার আগে কয়লায় চালিত রেল বগিতে লাল বাতিসহ রিং বেজে উঠলেই যাত্রীরা জানালা বন্ধ করে দিত, নইলে ধোঁয়ায় দম বন্ধ হবার উপক্রম হত, সবচে বড় গুহাটি ছিল এক মাইল, এ

সময় জানালা খোলা থাকলে আগুনের স্ফুলিঙ্গ ভেতরে ঢুকে জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে যেতো। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ডামাডোল শুরু হলে বাবা বুঝতে পেরেছিলেন,

গ্রামে থাকলে খাদ্যাভাব হতে পারে, এজন্য পুরো পরিবার নিয়ে আসাম চলে এলেন, তাঁর দেখাদেখি বাবার দুই কাকার পরিবারও আসাম চলে এলেন, বাড়িতে সবার দোতালা ঘরসহ অন্যান্য ঘরে তালা লাগিয়ে দিলেন, বাবা প্রয়োজনীয় খোরাকীসহ পাশের কারিগর বাড়ির ‘গইজ্জার মা’কে রেখে আসেন ঘর পাহাড়া দেয়ার জন্য। পিতার

পরিবার মরানহাটের নাসির খাঁ পট্টিতে বসবাস শুরু করলেন, আমাদের পরিবারের বাসা শিবসাগর জেলার মরানহাটের মসজিদ রোডের নাসির খাঁ পট্টিতে আগুন লাগার কারনে জুম্মন বেপারীর বাড়িতে স্থানান্তরিত হল, ২ বছর থাকার পর দোকান বা ব্যবসা কেন্দ্রের পেছনে ইয়ারনির বাড়িতে বাসাটি চলে এলো,

এ বাড়িতে কাঠ টিনের ঘরে বসবাসরত থাকা অবস্থায় মামলায় জিতে অর্ধেকটা রানির মা দখলে নিলেন, উল্লেখ্য, নাসির খার বাড়ি ওয়ারীতে, জুম্মন বেপারী, ইয়ারনি ও রানির মা সবার বাড়ি বিক্রমপুরে, ইয়ারনি

আমাদের ভাগ্নে শহীদুলদের আত্মীয়। বাবা দ্বিতীয় ভাই ছামাদ খানকে ব্যবসায় সম্পৃক্ত করলেন, গ্রাম থেকে খবর আসতো সেখানে খাবার সংকট ও বসন্ত রোগে বহু লোক মারা যাচ্ছে, ইংরেজী ১৯৪৩ বাংলা ১৩৫০ সময়কালকে ইতিহাসে ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ বলা হয়, তখন আমাদের দেশেও বহু লোক মারা যায়,

যুদ্ধের কারনে সরবরাহ না থাকায় টাকা দিয়েও খাবার পাওয়া যায়নি। বাবা যে মহিলাকে (গইজ্জার মা) ঘরে রেখে এসেছিলেন তিনি বসন্ত রোগে ঘরেই মরে পঁচেছিলেন, দুর্গন্ধ ছড়ালে লোকজন দরজা ভেঙে বেত দিয়ে বেঁধে পানিতে টেনে নিয়ে হাতারপাড়া গোরস্থানে মাটিচাপা দিয়ে আসেন। এ ঘটনা শুনে দাদী গ্রামে আসার জন্য

কান্নাকাটি করেন, যুদ্ধের কারণে রাস্তায় চলাচল বিপদজনক ছিল, পরিস্থিতি কিছুটা অনুকুল হলে বাবা এবং তার ভাই ছামাদ খান বাদে সবাই গ্রামে চলে আসেন। কাকা ছামাদ খান আলাদাভাবে একটি প্রসাধন সামগ্রীর মনোহরী দোকান দিয়েছিলেন, তখনো দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হয়নি,

পাশেই মিত্র বাহিনীর সেনা ক্যাম্প, এখানকার গোর্খা সৈন্যরা দোকানের জিনিষপত্র বাকী নিয়ে টাকা দিত না, কাকার দোকানে অনেক বাকি পড়ে গেল , মাল না দিলে ভয় দেখাতো, বিষয়টি বাবাকে জানালে তিনি একদিন

দোকানের পাশে বসে থাকলেন দৃশ্য দেখার জন্য, দু’জন গোর্খা সৈন্য এসে কাকার সাথে তর্কে লিপ্ত হলে সুঠামদেহী বাবা ঐ দু’জনকে গামছা দিয়ে বেঁধে রাখেন,

এ খবর কাম্পে পৌঁছালে সাইরেন বাঁজিয়ে অনেক সৈন্য চলে আসে, আত্মরক্ষার জন্য বাবা ঘোড়ায় চড়ে ১০ কি:মি: পর্যন্ত গিয়ে একটি খাবার হোটেলে আশ্রয় নিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি, ওরাও ১০/১২ জন ঘোড়ায় চড়ে পিছু নিয়ে বাবাকে রাইফেলের বাট দিয়ে আঘাত করে মৃত ভেবে ফেলে রেখে যায়, মরানহাটের সুশীল ডাক্তার

চিকিৎসা করে সুস্থ্য করেন, কিন্ত পিতার নাকের ক্ষত সাড়াতে বহু বছর লেগে যায়। ঐ দিন থেকে কাকার মনোহরী ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেল। সূত্র: আব্দুর রহমান খান

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here