ভার্চুয়াল কোর্ট চলানোর বিষয়ে নির্দেশিকা জারি

মু.নিউজ ডেক্স :করোনা ভাইরাসের মহামারির মধ্যে আসামি, সাক্ষী এবং আইনজীবীদের সশরীরে উপস্থিতি ছাড়াই তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে কীভাবে ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রম চলবে, সে বিষয়ে নির্দেশিকা জারি করেছেন সুপ্রিম কোর্ট। সরকার ঘোষিত ছুটির মধ্যে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত এই ‘প্র্যাকটিস ডাইরেকশন’ অনুসরণ করেই দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের চেম্বারজজ ও হাইকোর্ট এবং নিম্ন আদালতের বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

এছাড়া আইনজীবীদের ভার্চুয়াল আদালত ব্যবহারের বিষয়ে ‘আমার আদালত: ভার্চুয়াল কোর্টরুম ব্যবহার ম্যানুয়াল’ নামে আলাদা একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করেছেন সুপ্রিম কোর্ট। এই ভার্চুয়াল কোর্ট পরিচালনার জন্য এরইমধ্যে একটি ওয়েবপোর্টাল চালু করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সুপ্রিম কার্টের একজন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, আবেদন, শুনানি সবই হবে এ পোর্টালের মাধ্যমে। ইমেইলে শুনানির সময় জানিয়ে ভিডিও কনফারেন্সের লিংক পাঠানো হবে আইনজীবীকে। এসএমএসে দেয়া হবে অ্যালার্ট।

নির্দিষ্ট সময়ে বিচারক ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবী যুক্ত হবেন ভিডিও কনফারেন্সে। শুরুতে এ পদ্ধতিতে শুধু জামিন আবেদন দাখিল, শুনানি ও বেইল বন্ড দাখিলের সুযোগ পাবেন আইনজীবীরা। পরে অন্যান্য বিচারিক কার্যক্রমও পরিচালনার সুযোগ সেখানে রাখা হয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা। কোভিড-১৯ মহামারির মধ্যে আদালতের প্রায় সকল কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরকার ভিডিও কনফারেন্সসহ অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে আদালতের কার্যক্রম চালানোর সুযোগ রেখে একটি অধ্যাদেশ জারি করে।

তারই আলোকে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন রোববার ভার্চুয়াল আদালতের ‘প্র্যাকটিস ডাইরেকশন’ নির্ধারণ করে দেন। রোববার সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. আলী আকবর তিনটি আলাদা আদেশের মাধ্যমে এই ‘প্র্যাকটিস’ নির্দেশনা সবাইকে জানিয়ে দেন।

আমার আদালত: ভার্চুয়াল আদালতে বাদী/বিবাদীর পক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য একজন আইনজীবীকে নিজের নাম, ছবি, ইমেইল ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর দিয়ে নিবন্ধন করতে হবে। নিবন্ধন ও অন্যান্য কাজটি হবে ভার্চুয়াল আদালতের ওয়েবপোর্টালের মাধ্যমে। রেজিস্ট্রেশন হওয়ার পর ইউজার নেম ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করে আইনজীবী ভার্চুয়াল কোর্ট পোর্টালে ঢুকতে পারবেন।

সেখানে জামিন আবেদন ও বেইল বন্ড দাখিল সংক্রান্ত দুটি ঘর থাকবে। কোনো আইনজীবী জামিন আবেদন করতে চাইলে জামিন সংক্রান্ত ঘরে প্রবেশ করে মূল জামিন আবেদন, ওকালতনামা ও সংযুক্ত নথিপত্র পৃথক তিন ধাপে আপলোড করবেন।

এ ক্ষেত্রে কোনো আবেদন ফি লাগবে না। আবেদন দাখিলের পর সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের কর্মকর্তা এ আবেদনটি শুনানির জন্য গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করবেন। সংশ্লিষ্ট বিচারকের অনুমোদনের পর আইনজীবীর ইমেইলে শুনানির সময় জানিয়ে ভিডিও কনফারেন্সের জন্য একটি লিংক দেয়া হবে।

নির্ধারিত সময়ে ওই লিংকে ঢুকে আইনজীবী বিচারকের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হবেন এবং নিজের আবেদনের ওপর শুনানি করবেন। জামিন মঞ্জুর হলে একই পোর্টালে বেইল বন্ড দাখিল করতে পারবেন আইনজীবী।

আদালতের জন্য নির্দেশনা: আসামি, সাক্ষী এবং আইনজীবীদের সশরীরে উপস্থিতি না হলেও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের যুক্ত করার মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট এবং নিম্ন আদালতগুলোকে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে ‘আদালত কর্তৃক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশে’।

আর সেই ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রম কীভাবে চলবে সে বিষয়ে আপিল বিভাগের জন্য ১৩ দফা, হাইকোর্টের জন্য ১৫ দফা এবং অধস্তন আদালতের জন্য ২১ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। অধ্যাদেশে বলা হয়েছে,

ফৌজদারি কার্যবিধি বা দেওয়ানি কার্যবিধি বা আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে ভিন্নতর যাই থাকুক না কেন, যেকোনো আদালত এই অধ্যাদেশের ধারা ৫ এর অধীন জারিকৃত প্র্যাকটিস নির্দেশনা (বিশেষ বা সাধারণ) সাপেক্ষে, অডিও-ভিডিও বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে বিচারপ্রার্থী পক্ষরা বা তাদের আইনজীবী বা সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তি বা সাক্ষীর ভার্চুয়াল উপস্থিতি নিশ্চিত করে যেকোনো মামলার বিচার বা বিচারিক অনুসন্ধান বা দরখাস্ত বা আপিল শুনানি বা সাক্ষ্যগ্রহণ বা যুক্ততর্ক গ্রহণ বা আদেশ বা রায় প্রদান করতে পারবে।

অডিও-ভিডিও বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে বিচারপ্রার্থী পক্ষ বা তাদের আইনজীবী বা সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তি বা সাক্ষীর ভার্চুয়াল উপস্থিতি নিশ্চিত করা ছাড়া অন্যান্য বিষয়ের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি বা ক্ষেত্রমতে দেওয়ানি কার্যবিধি অনুসরণ করতে হবে।

এতদিন বিচারিক আদালতে সাংবিধানিকভাবে বিচারকার্য চালাতে আসামি, সাক্ষী এবং আইনজীবীদের সশরীরে উপস্থিতি প্রয়োজন হতো। এ অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির ভার্চুয়াল উপস্থিতি নিশ্চিত করা হলেই তা সশরীরে আদালতে উপস্থিতি হিসেবে গণ্য হবে।

ভার্চুয়াল উপস্থিতির সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, অডিও-ভিডিও বা অনুরূপ অন্য কোনো ইলেকট্রনিক পদ্ধতির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির আদালতের বিচার বিভাগীয় কার্যধারায় উপস্থিত থাকা বা অংশগ্রহণ। বাংলাদেশের প্রত্যেক জেলার, জেলা ও দায়রা জজ, মহানগর এলাকার মহানগর দায়রা জজ, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক, বিশেষ জজ আদালতের বিচারক, সন্ত্রাসদমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক,

দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক, জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এবং জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নিজে অথবা তার নিয়ন্ত্রণাধীন এক বা একাধিক ম্যাজিস্ট্রেটকে দিয়ে এই ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে।

তবে ‘বিশেষ প্র্যাকটিস নির্দেশনা’ অনুসরণ করে নিম্ন আদালতে আপাতত কেবল জামিন সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করা যাবে। হাইকোর্ট বিভাগে ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনার জন্য তিনটি বেঞ্চ গঠন করে দেয়া হয়েছে, যেখানে ‘অতি জরুরি’ রিট ও দেওয়ানি মামলা,

ফৌজদারি মামলা ও সংশ্লিষ্ট জামিন আবেদন এবং সম্পত্তি, বিবাহবিচ্ছেদসহ কিছু মামলার শুনানি করা যাবে। এ ছাড়া বিচারপতি নুরুজ্জামানকে দেয়া হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালত পরিচালনার দায়িত্ব। তিনি ১৪ ও ২০ মে বেলা সাড়ে ১১টা থেকে ভার্চুয়াল আদালতে শুনানি নেবেন।

তবে ভার্চুয়াল প্র্যাকটিস বাংলাদেশে এই প্রথম। কীভাবে এতে অভ্যস্ত হবেন আইনজীবীরা। সেই আলোকে সুপ্রিম কোর্টের রাষ্ট্রপক্ষের মামলা পরিচালনার জন্যে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমসহ কার্যালয়ের আইনজীবীদের নিয়ে এক প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের দাবি: ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের দাবি হাইকোর্টে আবেদন করার পর যেকোনো মামলার নথি ২৪ ঘণ্টা আগে আমাদের রাষ্ট্রপক্ষের নির্ধারিত আইনজীবীর হাতে পৌঁছাতে হবে।

এই মামলাটি যখন শুনানির জন্য নির্দিষ্ট করা হবে তার চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা আগে তাদের (রাষ্ট্রপক্ষের) সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের (অ্যাটর্নি কার্যালয়ের কর্মকর্তাকে) আইনজীবীকে জানাতে হবে। ইউএনডিপির কর্মকর্তা ও জেন্ডার এক্সপার্ট বিথিকা হাসান বলেন, আমরা (১০ মে) হাইকোর্টে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের ট্রেনিংয়ে সহযোগিতা করেছি।

এটা সিরিজ ট্রেনিং চলছে। আগামীতে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদেরও ট্রেনিংয়ে সহযোগিতা করব। সবমিলিয়ে (লোয়ার কোর্ট) বিচারিক আদালতে সিরিজ অব ট্রেনিং অব্যাহত রয়েছে। বিথিকা হাসান আরও বলেন, ভার্চুয়াল কোর্ট সিস্টেম সম্পূর্ণ নতুন। যখন আদালতে এই পদ্ধতিতে ব্যবহারিক কাজ শুরু হয়ে চলবে তখন এর সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে আরও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হতে পারে। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন,

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ভার্চুয়াল কোর্ট পরিচালনার বিষয়ে বলার পরিপ্রেক্ষিতেই ভার্চুয়াল কোর্ট পরিচালনার উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করেছেন প্রধান বিচারপতি। সরকার এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছেন, এখন ভার্চুয়াল কোর্টে কাজ করার জন্য আমাদের আইনজীবীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here