মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ছবি ওরা ১১ জনের পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম

download (1)মোহাম্মদ সেলিম:

চাষী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে সবার কাছে সুপরিচিত। তিনি ১৯৬১ সালে সেই সময়ের আরেক খ্যাতিমান পরিচালক ফতেহ লোহানীর সাথে আসিয়া চলচ্চিত্রে সহকারী পরিচালক মাধ্যমে হাতেখড়ি হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর প্রখ্যাত সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকার ওবায়েদ উল

হকের সহকারী হিসাবে ‘দুইদিগন্ত’ চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন ১৯৬৩ সালে। তারপরে ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধের পর তিনিই প্রথম নির্মাণ করেন মুক্তিযুদ্ধ ভিক্তিক চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’। এই চলচ্চিত্রটি ১৯৭২ সালে মুক্তি পাওয়ার মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে চাষী নজরুল ইসলামের চলচ্চিত্র অঙ্গনে আত্মপ্রকাশ ঘটে।

১৯৪১ সালের ২৩ অক্টোবর মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার সমষপুর গ্রামে চাষী নজরুল ইসলাম জন্ম গ্রহণ করেন। চাষী ছিলেন বাবা-মায়ের জ্যেষ্ঠপুত্র। বাবা মোসলেহ উদ্দিন আহম্মদ, ভারতের বিহারে টাটা আয়রন এন্ড স্টীল কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন।

বাবা মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ লস্করের পূর্বপুরুষেদের সমন্ধে যা জানা যায় সে অনুযায়ী প্রথম পুরুষ আমিন লস্কর, তারপর মোমেন লস্কর। এভাবে আহমেদ লস্কর, জরিপ লস্কর তারপর চাষীর দাদা হেলাল উদ্দিন আহমদ লস্কর। জানা যায়, শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক চাষীর নাম রেখেছিলেন।

চাষীর মামা চাষী ইমাম উদ্দিন শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হকের সঙ্গে রাজনীতি করতেন এবং নবযুগ ও লাঙ্গল পত্রিকার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সেই সূত্রেই একদিন ফজলুল হককে একটা নাম দিতে বলা হলে তিনি চাষী ইমাম উদ্দিনের ‘চাষী’ আর কাজী নজরুল ইসলামের ‘নজরুল ইসলাম’ মিলিয়ে একটা নাম দেন।

তিন মাস বয়সের চাষীকে নিয়ে চাষীর মা স্বামীর চাকরিস্থল ভারতের জামশেদপুরে গিয়েছিলেন। তারপর টানা চার বছর সেখানে ছিলেন। এরপর কিছুদিনের জন্য আবার নিজেদের গ্রাম শ্রীনগরে ফিরে আসেন। শ্রীনগরে চাষীদের বাড়ির সামনে বেশ খোলা জায়গা ছিল। তার কিছু অংশে পারিবারিক হাট বসতো।

এ কারণে সবাই বলতো এটি হাটখোলা। পাশেই ছিল একটা প্রাইমারি স্কুল। এ স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন চাষীর মামা চাষী ইমাম উদ্দিন। বর্তমানে এটি সমষপুর হাইস্কুল ও কলেজ হিসেবে রূপান্তর হয়েছে। ঐ স্কুলেই চাষিকে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি করানো হয়। ক্লাস টুতে ওঠার পর চাষীর বাবা আবার তাকে নিয়ে গেলেন জামশেদপুরে। ওখানে চাষীর বাবারই প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল মুসলিম স্কুলে তিনি ফাইভ পর্যন্ত পড়েন।

তারপর ক্লাস সিক্স-সেভেন পড়েন গোলামুড়ি মাধ্যমিক স্কুলে। তারপর আরডি টাটা হাইস্কুলে এখান থেকেই পরে চাষী ইলেভেন পাস করেন। ঠিক এ সময় চাষীর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। বাবা অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও তিনি চাননি সবাই শ্রীনগরে ফিরে আসুক। মোসলেহ উদ্দিন ভেবেছিলেন টাটা কোম্পানিতে চাষীর একটা চাকরি হবে। মূলত

তিনি জামশেদপুরে স্থায়ীভাবে থাকার পরিকল্পনা করে ছিলেন। চাষীর মা শায়েস্তা খানম সেরকমটি চাইলেন না। শেষমেশ ১৯৫৮ সালে সবাই শ্রীনগরে চলে আসেন।

১৯৫৭ সালের দিকে মুসলেহ উদ্দিন অসুস্থ হয়ে পড়েন। টাটার চাকরি ছেড়ে দিয়ে সপরিবারে স্বদেশে চলে এলেন। কিছুদিন পর তিনি মারা যান। পিতার শোক ভুলে যাবার আগেই সংসারে বড় ছেলে হিসেবে সব দায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়ে।

তিনি এজি অফিসে অফিসের পোস্ট সর্টার হিসেবে ১৯৬৯ পর্যন্ত চাকরি করেন। এফডিসি মাত্র তখন গড়ে উঠছে। আউয়াল এর বিখ্যাত সিনেমা করিয়ে ফতেহ্ লোহানীর প্রধান সহকারী। চাষী চাকরির ফাঁকে ফাঁকে তার সঙ্গে সব সময়ে যোগাযোগ রাখতেন।

এ সময়ে একই সঙ্গে শুরু করলেন নাটক। তিনি আলী মনসুর এর কৃষ্টি সংঘের সঙ্গে কাজ করেন এবং মঞ্চে অভিনয় করেন। এদিকে চাষীর সিনেমা প্রীতিটা জানতেন তার খালাতো বোনের স্বামী সৈয়দ আওয়াল। একদিন সুযোগ এলো। চাষীকে পরিচয় করিয়ে দিলেন পরিচালক অভিনেতা ফতেহ লোহানীর সাথে। ফতেহ লোহানী তখন ‘আছিয়া’ ছবির পরিচালনা করছিলেন।

সেই ছবিতে চাষীকে ছোট্ট একটা রোল করার জন্য ফতেহ লোহানী তাকে নেন। কিন্তু ফতেহ্’র নির্দেশে এর পরের দিনই তাকে সহকারী পরিচালকের দায়িত্ব দেয়া হয়। চাষি নজরুল ইসলাম ১৯৬১‘র জুন মাসে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন।

এরপর তিনি ১৯৬৩ তে কাজ করেছেন প্রখ্যাত সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রাকার ওবায়েদ-উল-হকের সহকারী হিসাবে ‘দুইদিগন্ত’ ছবিতে। এভাবে কাজ করতে করতে এলো ১৯৭১। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেন আর সবার মতো। তারপর যুদ্ধশেষে বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধ ভিক্তিক চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’ নির্মাণ করলেন।

১৯৭২ এ এই ছবির মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে চাষী নজরুলের আত্ম প্রকাশ ঘটলো। এছাড়া নিয়মিত বেতারে, টিভিতে অভিনয় অব্যাহত ছিল।

তিনি মোট দুটি ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। সেই ছবি দুটি হচ্ছে, আছিয়া (১৯৬১) ও দুই দিগন্ত (১৯৬৪)। তিনি যেসব ছবিতে পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন সেগুলো হচ্ছে, ওরা ১১ জন (১৯৭২),

সংগ্রাম (১৯৭৪), ভালো মানুষ (১৯৭৫), বাজিমাত (১৯৭৮), দেবদাস (১৯৮২) চন্দ্রনাথ (১৯৮৪), শুভদা (১৯৮৬), লেডি স্মাগলার (১৯৮৬), মিয়া ভাই (১৯৮৭),

বেহুলা লক্ষিন্দর (১৯৮৭), বিরহ ব্যথা (১৯৮৮), মহাযুদ্ধ (১৯৮৮), বাসনা (১৯৮৯), দাঙ্গা ফাসাদ (১৯৯০), পদ্মা মেঘনা যমুনা (১৯৯১), আজকের প্রতিবাদ (১৯৯৫), শিল্পী (১৯৯৫), হাঙর নদী গ্রেনেড (১৯৯৭), হাছন

রাজা (২০০১), কামালপুরের যুদ্ধ (২০০২), মেঘের পরে মেঘ (২০০৪), শাস্তি (২০০৪), সুভা (২০০৬), ধ্রুবতারা (২০০৬), দুই পুরুষ (২০১১), দেবদাস (২০১৩) ও অন্তরঙ্গ (২০১৫) (মৃত্যুর পর মুক্তিপ্রাপ্ত)।

১৯৬৯ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর দেশের অন্যতম বিখ্যাত কাজী পরিবারের কে.জি.আহমেদের মেয়ে জোৎস্না কাজীকে বিয়ে করলেন চাষী নজরুল ইসলাম। তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতিতে চারবারের মতো সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। সব শেষে ২০০২-২০০৪ পর্যন্ত তিনি নির্বাচিত ছিলেন।

তিনি পরিচালক হিসেবে একাধিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। যেসব প্রতিষ্টান তাকে পুরস্কারে সেগুলো হচ্ছে, ১. বাংলাদেশ সিনে জার্নালিষ্ট এ্যসোসিয়েশন এওয়ার্ড সংগ্রাম ১৯৭৪ শ্রেষ্ঠ পরিচালক, ২. জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার শুভদা ১৯৮৬ শ্রেষ্ঠ পরিচালক, ৩. সিনে ডিরেক্টরাল এসোসিয়েটস সার্বিক বিবেচনায় ১৯৮৫ চলচ্চিত্র নির্মাণ, ৪. শের-ই-বাংলা স্মৃতি পুরস্কার। সার্বিক বিবেচনায় ১৯৮৮ শ্রেষ্ঠ পরিচালক,

৫. বাংলাদেশ ফিল্ম ক্রিটিকস। বিরহ ব্যথা ১৯৮৯ শ্রেষ্ঠ পরিচালক, ৬. বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইয়ুথ অর্গানাইজেশন ফেডারেশন এওয়ার্ড। সার্বিক বিবেচনায় ১৯৮৯ শ্রেষ্ঠ পরিচালক, ৭. সিনে ডিরেক্টরাল সোস্যাল ওয়েলফেয়ার। সার্বিক বিবেচনায় ১৯৮৯ পরিচালনায়, ৮. বাংলাদেশ সোস্যাল ওয়েলফেয়ার। সার্বিক বিবেচনায় ১৯৯৫ চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব, ৯. স্যার জগদীশচন্দ্র বসু স্বর্ণপদক। সার্বিক বিবেচনায় ১৯৯৫ চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব,

১০. জহির রায়হান স্বর্ণপদক। সার্বিক বিবেচনায় ১৯৯৫ চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব, ১১. জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ১৯৯৭ হাঙর নদী গ্রেনেড ১৯৯৭ শ্রেষ্ঠ পরিচালক, ১২. একুশে পদক। ২০০৪।, ১৩. বিনোদন বিচিত্রা অ্যাওয়ার্ড । ২০০৩ শ্রেষ্ঠ পরিচালক, ১৪. জেনেসিস নজরুল সন্মামনা পদক । ২০০৩

১৫. বি.সি. আর.এ.অ্যাওয়ার্ড । ২০০৫ শ্রেষ্ঠ পরিচালক, ১৬. তারকালোক অ্যাওয়ার্ড । ১৯৯৭।, ১৭. আন্তজাতির্ক বাংলাদেশ ইন্দোকালা মিউজিক । ২০০৩ জহির রায়হান আজীবন সন্মাননা, ১৮. ঈঔঋই অ্যাওয়ার্ড । শ্রেষ্ঠ পরিচালক।, ১৯. আন্তজাতির্ক কালাকার পুরস্কার। ২০০৫ শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রএবং শ্রেষ্ঠ পরিচালক ও ২০. ট্রাব অ্যাওয়ার্ড । ২০০৩।

চাষী নজরুল ইসলাম ২০১৪ সালের মে মাস থেকে চিকিৎসক সৈয়দ আকরামের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। তার মাঝে তার বেশ কয়েকবার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সেখানে ২০১৫ সালের ১১ই জানুয়ারি রোববার ভোর পাঁচটা ৫৫ মিনিটে এই চলচ্চিত্র নির্মাতা মৃত্যুবরন করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here