হারিয়ে যাওয়া মুক্তিযুদ্ধের সনদ উঠাতে দপ্তরে দপ্তরে ঘুরছেন বিল্লাল গাজী

4মোহাম্মদ সেলিম ও তোফাজ্জ্বল হোসেন:

মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার আধারা ইউনিয়নের জাজিরা গ্রামের গাজী বাড়ির বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: বিল্লাল হোসেন গাজী। এক দিকে তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা। অন্য দিকে তিনি ইতোমধ্যে সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। সততা ও নিষ্টার সাথে জীবনের বেশিরভাগ সময়টুকু সরকারি চাকরিতে পার করেছেন।

এর মধ্যেই তিনি জীবনের বড় একটি সম্পদ মুক্তিযোদ্ধার সনদপত্রটি হারিয়ে ফেলেছেন। আর হারিয়ে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধের সনদটি ফিরে পেতে তিনি বর্তমানে সরকারের একাধিক দপ্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

কিন্তু কোনভাবেই তিনি এটি এখন আর ফিরে পাচ্ছেন না। এ দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ঘুরে ঘুরে তিনি জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে বড়ই হতাশ হয়ে পড়েছেন। মো: বিল্লাল হোসেন গাজী জাজিরা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন।

তার পিতার নাম হচ্ছে মৃত আলহাজ্ব আ: হাকিম গাজী। তিনি তৎকালিন হরগঙ্গা কলেজে বি.এ পড়াকালিন সময়ে ১৯৬৮ খ্রি: থেকে ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। সেই সময়ে ১৯৬৯ খ্রি: তিনি কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়ন থেকে ভিপি প্রার্থী হন।

তার বিপরিতে প্রার্থী ছিলেন ছাত্রলীগ থেকে বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আনিসুজ্জামান আনিস। সেই নির্বাচনে আনিস জয়লাভ করেন। সেই সময়ে পাকিস্তান স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তিনি সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেন। ১৯৭১ খ্রি: মার্চ মাসের শেষের দিকে তিনি গ্রামের বাড়ি জাজিরা চলে যান।

জাজিরা গ্রামটি ভৌগলিকভাবে মেঘনা নদীদ্ধারা বেষ্টিত। জাজিরার মেঘনা নদীর পূর্ব দিকে হচ্ছে চাঁদপুরের মতলব উপজেলা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময়ের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝিতে ঢাকার নবাবগঞ্জের মো: আজিজুর রহমান চৌধুরী তার সাথে দেখা করতে এই জাজিরা চলে আসেন। এ সময়ে ভারতে মুক্তিযুদ্ধে ট্রেনিং নেয়ার জন্য এখান থেকে কিভাবে লোকজন পাঠানো যায় তা নিয়ে আলাপ ও আলোচনা হয়।

তারপরে তিনি আমিরুল ইসলামসহ মতলবের সংসদ সদস্য গোলাম মোর্শেদ ফারুকী ও আব্দুর রহমান মাস্টারের সাথে দেখা করেন। মতলবের বেলতলি গ্রামের তৎকালিন ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের ছাত্র আবুল হোসেনের সাথে ঐ বিষয়ে আলোচনা হয়।

এরপর থেকে লৌহজং ও শ্রীনগর উপজেলা থেকে প্রতিদিন কয়েকজন করে লোকজন তাদের বাড়িতে আসতে থাকে। সেইসব লোকজনকে তাদের বাড়িতে থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করা হতো। তার মা এ কাজ গুলো করে দিতো। পরে সুযোগ বুঝে তাদেরকে পৌঁছে দেয়া হতো মতলবে। এ কাজটিও তিনি করতেন। সেখান থেকে হাত বদলের মাধম্যে আগতরা পৌঁছে যেতো ভারতের মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং ক্যাম্পে।

এদিকে ভরা বর্ষা মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার দক্ষিণ ইসলামপুর গ্রামের সিরাজুল ইসলাম (সুরুজ) সাথে দেখা করতে তিনি এ বাড়িতে আসেন। বিষয়টি পাক বাহিনীর কাছে পৌঁছে যায়। তাই পাকি বাহিনী সকাল ৮টার দিকে এখানে অভিযান চালায়।

এ খবর সুরুজের বোন দিলে তিনি বাড়ির পাশের পুকুওে ঝাপ দেন। আর সুরুজ গোয়াল ঘরের কচুরি পানায় ডুব দেন। পাকিদের ছোড়া গুলি থেকে তারা দু’জনেই অল্পের জন্য সেদিন বেঁচে যান। পরে সেখান থেকে পাক বাহিনী চলে গেলে তিনি ও সুরুজ বাঘাইকান্দির কবির আহমেদর বাড়িতে আসেন।

সেখান থেকে পরামর্শ ক্রমে সুরুজ, কবির আহমেদ ও মফিজুর রহমান জাজিরা থেকে মতলব পাড়ি দিয়ে ভারতে মুক্তিযুদ্ধেও ট্রেনিংয়ের জন্য চলে যান। মুন্সীগঞ্জ শহরের কে.কে. স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো: সিরাজুল ইসলাম খান ও তৎকালীন দুর্নীতি দমন অফিসার মো: এছহাকের সাথে তিনি নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। তাদের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে, তাদে বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধার আনাগোনার বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়েছে।

কিন্তু তারা কৌশলে সেই অভিযোগ পত্র সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তাদের বাড়ি হয়ে সবশেষে ভারতে যান কোঁটগাঁও গ্রামের অনু। ভারত থেকে মুক্তিযোদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে এখানে আসেন মহাকালির ডা: আমান উল্লাহ। এসব খবর সাংবাদিক মহলে ছড়িয়ে গেলে তাকে খবর পাঠান সাংবাদিক সফিউদ্দিন আহমেদ।

তিনি লৌহজংয়ের মোকাম খোলায় তার সাথে দেখা করেন। এদিকে টঙ্গীবাড়ী উপজেলার আলী ইমাম খবর পাঠান এ পথ দিয়ে প্রায় ৪০ জনের মতো লোকজনকে মতলবে পাঠাতে হবে। তাদেরকে গভীর রাতে নদী পার করে দেয়া হয় স্থানীয়দের সহযোগিতায়। ভারত থেকে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে জাজিরা আসেন বাংলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমসহ নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিউনিষ্ট পার্টির সভাপতি মন্টু ঘোষ, মফিজুর রহমান,

কবির আহমেদ, জামাল হোসেন, সিরাজুল ইসলাম সুরুজসহ আরো অনেকেই। সেই সময় তিনি তার বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে নৌকা কওে তাদেরকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেয়া হয়।এ পরিবারটি রাজনৈতিক পরিবার হিসেবে অত্র এলাকায় সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই সবার কাছে পরিচিত। তার বাবার বড় ভাই পানচব আলী গাজী ব্রিটিশ এবং পাকিস্তানী আমলে গণ পরিষদের প্রতিনিধি ছিলেন।

এরপর তার বাবাও গণ পরিষদের প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তার ছোট ভাই আমির হোসেন গাজী ঢাকা দক্ষিণের যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। আমির হোসেন গাজী আধারা ইউপি চেয়ারম্যান, মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

এরপর তার স্ত্রী বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় তার ক্রমিক নং হচ্ছে ২৬৭। এটি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গেজেটে প্রকাশিত হয়। মুন্সীগঞ্জ জেলার ট্রেজারি শাখার এফ এফ বাহিনীর রেজি: নং ১ এর ৩৪৩ ক্রমিকে তার নাম লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here