ইলিয়াস কাঞ্চনকে ‘বেকুব’ বললেন আ’লীগ: নেতা শাজাহান খান

eliash-kanchan-262636মাসুদ রানা রাব্বানী:

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান জনপ্রিয় চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনকে ‘বেকুব’ বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও আ’লীগের সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খান এমপি। শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজশাহীতে ফেডারেশনের বিভাগীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি ইলিয়াস কাঞ্চন সম্পর্কে এ মন্তব্য করেন।

শাজাহান খান তখন সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ নিয়ে শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে কথা বলছিলেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে কিছু বুদ্ধিজীবী আছেন, যেই বুদ্ধিজীবীরা পরিবহন শ্রমিকদের দেখতে পারে না। তারা মনে করে যে, পরিবহন শ্রমিকদের ফাঁসি দিলেই বোধ হয় দুর্ঘটনা সব বন্ধ হয়ে যাবে। বাংলাদেশে এইটা যারা বলেন, তারা হাস্যকর কথা বলছেন। পৃথিবীতে বহু দেশেই তো হত্যা যারা করেন, ফাঁসির আইন আছে না? তার জন্য কি খুন বন্ধ হয়ে গেছে?’

শাজাহান খান বলেন, ‘সড়ক পরিবহন আইনটি একটা প্রেক্ষাপটে তাড়াহুড়ো করে পাস করতে হয়েছিল। ঢাকায় একজন ছাত্র এবং একজন ছাত্রী গাড়িচাপায় যে মারা গেল মহাখালিতে, তার পরের পরিস্থিতি আপনাদের জানা আছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-ছাত্রীরা তখন আন্দোলন করছিল। ওই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী বললেন, আইন আমরা কঠোরভাবে পাস করব। আইন সেদিন পাস করতে হলো। সেই আন্দোলন প্রশমিত হলো। আইন যেটা পাস হলো তার অসঙ্গতিগুলো আমরা তুলে ধরেছি।’

তিনি বলেন, ‘যুগোপযোগী আইন করার জন্য ফেডারেশনের পক্ষ থেকে আমরাই কিন্তু দাবি তুলেছিলাম। এরশাদ সাহেবের শাসনামল থেকে আমরা বলে আসছি যুগোপযোগী আইন করতে হবে। তারপর অনেক সরকার পার করলাম। শেখ হাসিনার সরকারে এসে আমরা সেই আইন পাস করাতে পেরেছি। এর মধ্যে সংশোধনীগুলো আমরা দিয়েছি সরকারের কাছে।

আমরা আমাদের যৌক্তিক দাবিগুলো তুলে ধরেছি। তিনজন মন্ত্রী এই কমিটির মেম্বার ছিলেন, সচিব ছিলেন কয়েকজন। তারা সকলেই কিন্তু আমাদের দাবির যে দিকগুলো যৌক্তিক সেগুলো গ্রহণ করছেন। আশা করছি- আগামী সংসদ অধিবেশনে বা বাজেট অধিবেশনে সংশোধনীগুলো পাস হবে।’

সরকারের সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, ‘ইলিয়াস কাঞ্চন একজন বিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ। উনি বলেন, এই আইন যদি সংশোধন হয় তাহলে বাংলাদেশ হেরে যাবে। কত বড় বেকুব হলে এ কথা বলতে পারে আমি আশ্চর্য হয়ে যাই! ওই আইনের মধ্যে আছে- আপনি যদি ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করেন তাহলে ১০ হাজার টাকা জরিমানা হবে। আপনি যদি যেখান-সেখান দিয়ে রাস্তা পারাপার হন, ওইটা কিন্তু ট্রাফিক রুল ভঙ্গ করা হলো।

তাহলে ওই রুল যে ভঙ্গ করবে তারও ১০ হাজার টাকা জরিমানা হবে। বলেন তো, এটা কি যৌক্তিক ইয়ে হলো? আমরা সেক্ষেত্রে বলেছি- এইটা হতে পারে না। আমরা সেটাকে কমিয়ে আনার জন্য বলেছি। এটাকে এক হাজার বা পাঁচশোর মধ্যে আনতে হবে। যারা বলেন সংশোধন দরকার নাই, তারা মূলত আইনই পড়েননি।’

শাজাহান খানের বক্তব্য শেষ হলে মঞ্চের সামনে গিয়ে একজন শ্রমিক তার কাছে জানতে চান, ইলিয়াস কাঞ্চনের শাস্তি কেন হলো না। জবাবে শাজাহান খান বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে সরকারকে বলে দিয়েছি- ইলিয়াস কাঞ্চন কোন প্রোগ্রামে থাকলে আমরা মালিক-শ্রমিক নেতৃবৃন্দ সেই প্রোগ্রামে যাব না। ২২ অক্টোবর সড়ক নিরাপত্তা দিবস, সেখানে আমরা যাই নাই। কোন শ্রমিকও যায়নি, আমরা নেতারাও যাইনি।

একটা কথা শুধু বলে রাখি আপনাদের, আমি এই সমস্ত কথা বলার কারণে আমার বিরুদ্ধে একটা মামলা দিসে, ১০০ কোটি টাকার মানহানির মামলা। সেই মামলা চলমান। সেই মামলার একজন উকিল এখানে উপস্থিত। আপনারা দোয়া করবেন মামলায় ওকেই বরং পরাজিত করে তার কাছেই আমরা ক্ষতিপূরণ চাইব।’

শাজাহান খান বলেন, ‘আর একটা কথা বলে রাখি- এই ইলিয়াস কাঞ্চন সে কিন্তু বাংলাদেশের শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মানে কঠোর যা যা করা যায় সবকিছুর জন্য কিন্তু উনি নানাভাবে অবাস্তব কিছু প্রস্তাবও দিয়েছেন। ফেডারেশনের পক্ষ থেকে আমরা সর্বশেষ পরিস্থিতি দেখে তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করব। উনি তো শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করেন, কোথাও শ্রমিক ইউনিয়নে জায়গা দেবেন না তাকে।’

নগরীর নওদাপাড়ায় রাজশাহী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ফেডারেশনের রাজশাহী বিভাগীয় আঞ্চলিক কমিটি এর আয়োজন করে। এতে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী। বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন,

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক শিমুল বিশ^াস ও জয়পুরহাট জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রফিক। সভাপতিত্ব করেন ফেডারেশনের রাজশাহী বিভাগীয় আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি আবদুল লতিফ মণ্ডল। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মাহাতাব হোসেন চৌধুরী।

শাজাহান খানের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাল নিসচা : এদিকে, ‘ইলিয়াস কাঞ্চন একজন বিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ। উনি বলেন, এই আইনের যদি সংশোধন হয়, তাহলে বাংলাদেশ হেরে যাবে। কত বড় বেকুব হলে এ কথা বলতে পারেন, আমি আশ্চর্য হয়ে যাই।’ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাজাহান খান এমপির এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) এর রাজশাহী জেলা শাখা।

শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজশাহীতে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের বিভাগীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নিসচার প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনকে উদ্দেশ করে ওই মন্তব্য করেছিলেন সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান।

তিনি আরও বলেছিলেন, ‘ইলিয়াস কাঞ্চন কিন্তু বাংলাদেশের শ্রমিকদের বিরুদ্ধে, মানে কঠোর যা যা করা যায়, সবকিছুর জন্য কিন্তু উনি নানাভাবে অবাস্তব কিছু প্রস্তাবও দিয়েছেন। ফেডারেশনের পক্ষ থেকে আমরা সর্বশেষ পরিস্থিতি দেখে তাঁকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করব। উনি তো শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করেন, কোথাও শ্রমিক ইউনিয়নে জায়গা দেবেন না তাঁকে।’

এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে নিসচার জেলা শাখা গতকাল শনিবার একটি প্রতিবাদ বিবৃতি গণমাধ্যমে পাঠিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘নিসচার চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন ব্যক্তিস্বার্থে কোনকিছু করেননি। তাই তার বিরুদ্ধে এ ধরনের বক্তব্য প্রদান করলে এর বিরুদ্ধে দেশব্যাপী বুদ্ধিজীবী, অভিভাবক সমাজ, সুশীল সমাজ, সমাজ চিন্তাবিদ, ছাত্রজনতা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষকে নিয়ে অতীতের মত তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।’

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ প্রণয়ন বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার পর এর গুরুত্ব বিবেচনা করে সকলের মতামতে তা প্রণয়নের নির্দেশ দেন। সকলের মতামতে আইনটি পরবর্তীতে জারি করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আইনটি সম্পর্কে সকলকে সচেতন হবার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন। সুতরাং নিসচার চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন সম্পর্কে যে বিরূপ মন্তব্য করা হয়েছে তা কখনোই গ্রহণ করা যায় না।’

বিবৃতিদাতাদের মধ্যে রয়েছেন নিসচার রাজশাহী জেলা শাখার সভাপতি তৌফিক আহসান টিটু, সহ-সভাপতি ওয়ালিউর রহমান বাবু, সাধারণ সম্পাদক সুলতান মাহমুদ সুমন, সহ-সাধারণ সম্পাদক মামুনার রশীদ, অর্থ বিষয়ক সম্পাদক বজলুর রশীদ লিটন, সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. আমানুল্লাহ বিন আখতার আবিদ, দুর্ঘটনা অনুসন্ধান ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক দেওয়ান একরামুল হক বাচ্চু, দপ্তর সম্পাদক একেএম জাহেদুল ইসলাম প্রমুখ। #

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here