রাজা বল্লাল সেনের সময়ে রামপালে গজারি গাছ (ভিডিওসহ)

IMG_8073মোহাম্মদ সেলিম:

রাজা বল্লাল সেনের সময়ে রামপালে গজারি গাছ এখন ইতিহাসের সাক্ষি হয়ে দাাঁড়িয়ে আছে। মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার রামপাল ইউনিয়নের রামপাল কলেজের পূর্ব প্রান্তের শেষ সীমান্তে রয়েছে কাঠের শুকনো খুঁটির এই মহা মূল্যবান গজারি গাছটি।

এ গজারি গাছে রাজা বল্লাল সেনের সময়ে হাতি বেঁধে রাখা হতো বলে জনশ্রুতি রয়েছে। আরো জনশ্রুতি রয়েছে ১৯৩০ সালের মে মাসের দিকে এ গজারি গাছটি প্রথম বারের মতো মারা যাওয়ার পর থেকে এটি কাঠের শুকনো খুঁটিতে রূপ নেয়।

downloadবিক্রমপুরের ইতিহাসের লেখক যোগেন্দ্র নাথ গুপ্ত ১৯২৯ সালের দিকে জ্যান্ত গজারি গাছটি নিজের চোখে দেখেছেন। বিক্রমপুরের ইতিহাস বইটি বাংলার ১৩১৬ সালের ৩০শে আশ্বিন প্রকাশিত হয়। সেই ক্ষেত্রে বিক্রমপুরের ইতিহাসের বইয়ের বয়স হচ্ছে ১১২ বছর।

বর্তমানে সেই বইটি প্রাচীন বিক্রমপুরের ইতিহাসের জানা না অজানা অনেক ইতিহাসের সাক্ষি বহন করছে। সেই সময়ে এ গজারি গাছটি প্রায় ৬০ হাত লম্বা ছিল বলে বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। গাছটির ব্যাস বা এর বের ছিল প্রায় সাড়ে ৪ হাতের মতো। গজারি গাছটির দুটি শাখাও ছিল।

দেশ স্বাধীনের পরেও শুকনো এ গজারি গাছটি অনেক লম্বা ছিল। কিন্তু এক সময়ে ৬০ হাত লম্বা উঁচু এ গজারি গাছটি নষ্ট হতে হতে ৩ ফুট উচ্চতায় এসে থেমেছে। বর্তমানে এ গজারি গাছটি দেখলে মনে হবে এর উচ্চতা আরো কমে গেছে। আগে এ গজারি গাছটি উম্মুক্ত ছিল।

তখন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনরা গজারি গাছের ওপর নিচে সিঁদুর দিয়ে পূজা অর্”চনা করতো। অনেকে অভিমত প্রকাশ করেন যে, এখানে অনেকেই বিভিন্ন মানত নিয়ে ছুটে আসতো। এক সময়ে ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য এ গাছের চারিদিকে গোল লোহার বেরিকেট দেয়া হয়।

download (2)এর পরে ঐতিহাসিক গজারি গাছের চিহ্নকে ইতিহাসের সংরক্ষণ হিসেবে ধরে রাখার লক্ষ্যে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা প্রশাসন এখানে মুন্সীগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও মুন্সীগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো: মহিউদ্দিন এর সহযোগিতায় মুন্সীগঞ্জ জেলা পরিষদ থেকে অর্থ বরাদ্দের মাধ্যমে একটি ছোট দালান ঘর নির্মাণ করা হয়।

ইতিহাসবিদরা ধারণা করেন, দক্ষিণ দিকের ঐতিহাসিক গজারি গাছের ঠিক উত্তর দিকে রামপালের রাজা বল্লাল সেনের রাজ প্রাসাদের অবস্থান ছিল। এ কারণে উত্তর দিকে ইতিহাসের সাক্ষি হিসেবে আজো বয়ে বেড়াচ্ছে বল্লাল বাড়ির নাম। এখানে মজার আরেকটি বিষয় রয়েছে।

সেটি হচ্ছে গুগুল ম্যাপে সম্পূর্ণ রামপালটি স্কয়ার হিসেবে দেখা যাচ্ছে। আর এ গুগুল ম্যাপের একটি স্থানে রয়েছে রাজ বল্লাল সেনের রাজ প্রাসাদ। বিজ্ঞান ভিত্তিক অনুসন্ধ্যান করলে রাজা বল্লাল সেনের রাজ প্রাসাদের খোঁজ পাওয়া সম্ভব হবে বলে অনেকেই মনে করেন।

IMG_8075যোগেন্দ্র নাথ গুপ্তের বিক্রমপুরের ইতিহাস বইয়ে লিখেছেন যে, এ গজারি গাছের সাথে সেই সময়ে রাজা বল্লাল সেনের পোষা হাতি বেঁধে রাখা হত। আর এ বিষয়টিই বর্তমানে ইতিহাসে সাক্ষ্য দিচ্ছে। সেই সময়ে গজারি গাছের তলে রামপালের মেলা হতো।

এটি হতো চৈত্র মাসের অষ্টমি দিবসে। আর এ মেলাকে কেন্দ্র করে সেদিন বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ পৌর শহরের পূর্বদিকে যোগিনীঘাটে সেই সময়ে ব্রহ্মপুত্র নদীতে সনাতন ধর্মের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের স্নান হতো। ভৌগলিক কারণে নদী ভাঙ্গনে যোগিনীঘাটের নদীটি গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে।

download (1)রামপালের এই গজারি গাছের সাথে জনশ্রুতি জড়িয়ে রয়েছে। তা হলো রাজা আদিশুর। আর পঞ্চ ব্রাহ্মণদের নিয়ে। পঞ্চ ব্রাহ্মণ ও পঞ্চসার এবং পাঁচগাঁওয়ের ইতিহাস একই সূত্রে গাঁথা বলে ইতিহাসবিদরা মনে করছেন।
রাজা আদিশুর বিক্রমপুরে প্রাচীন রাজাদের মধ্যে একজন। সেই সময়ে রাজা আদিশুর বিক্রমপুরের রামপালে স্থায়ীভাবে বাস করতেন। তাঁর সময়ে বিক্রমপুরে বৌদ্ধদের অনাচারে এখানে ক্রমশ হিন্দুদের সংখ্যা কমতে থাকে। আর হিন্দু ধর্ম শিক্ষা এ জনপদ থেকে কমতে থাকে।

এ পরিবেশ আগের পর্যায়ে ফিরিয়ে আনতে তখন আদিশুর রামপালে হিন্দু ধর্মের এক যজ্ঞের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। তাতে পঞ্চ ব্রাহ্মণদের নিমন্ত্রণ করা হয়।

আদিশুরের নিমন্ত্রণে পঞ্চ ব্রাহ্মণরা পায়ে চামড়ার পাদুকা ও সার্বাঙ্গে বস্ত্র নিয়ে রাজবাড়ির দিকে ছুটেন। পঞ্চ ব্রাহ্মণরা তাম্বুল চুষতে চুষতে রাজবাড়ির প্রধান ফটকে উপস্থিত হন। পঞ্চ ব্রাহ্মণরা তাদের আগমন বার্তা প্রধান রক্ষিকে রাজার নিকট জানাতে বলেন। তাদের পোশাক ও চালচলনের কথা রাজার নিকট পৌঁছলে রাজা তাদের সাথে সাক্ষাত করতে কিছুটা বিলম্ব করেন।

এদিকে পঞ্চ ব্রাহ্মণরা তাদের সাথে আদিশুরের সাক্ষাত বিলম্ব হচ্ছে তার কারণ তাঁরা বুঝতে পারেন। তাই পঞ্চ ব্রাহ্মণরা তাদের ক্ষমতা বুঝানোর জন্য আদিশুরের হাতি বাঁধার শুকনো গজারি গাছে আর্শীবাদ প্রদান করেন। কিছুক্ষণ পর শুকনো গাছটিতে পাতায় পাতায় ভরে উঠৈ। এ ঘটনায় মরা গজারি গাছ জীবিত হয়ে উঠায় আদিশুর অবাক হন। তিনি পঞ্চ ব্রাহ্মণদের পঞ্চসার গ্রামে বাস করার অনুমতি প্রদান করেন।

এক্ষেত্রে কোন কোন জনশ্রুতিতে পাঁচগাঁওয়ের কথাও রয়েছে। এ ঘটনাটি সম্ভবত ১০৩২ খ্রিস্টাব্দে হয়েছে বলে ইতিহাসবিদরা মনে করছেন। ইতিহাসে আদিশুরের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। তবে বিজয় সেনের স্ত্রী বিলাস দেবী যিনি বল্লাল সেনের মা, তিনি ছিলেন শুর বংশীয় কন্যা।

এ বিষয়টি সেনরাজাদের তাম্রশাসন দ্বারা প্রমানিত হয়েছে। ভবদেবের ভুবনেশ্বর প্রশস্তি হতে আদিশুর কর্তৃক গোত্রিয় ব্রাহ্মণদের আনার প্রমাণ পাওয়া যায়। আবার প্রথম রাজেন্দ্র চোলের তিরুমলয় লিপিতে দক্ষিণ রাঢ়ে অধিপতি রণশুরের পরিচয় পাওয়া যায়।

ইতিহাসবিদরা ধারণা করছেন রণশুরের পুত্র বা প্রপুত্র অর্থাৎ নাতি হলেন আদিশুর। তবে এ গজারি গাছটি এখন ইতিহাসের সাক্ষি। এ গজারি গাছ নিয়ে ৯৫৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১০৩২ খ্রিস্টাব্দ হতে জনশ্রুতি চলে আসছে এ জনপদে।
তথ্য সূত্র: যোগেন্দ্র নাথ গুপ্তের বিক্রমপুরের ইতিহাস ও প্রত্নত্বত্ত গবেষক গোলাম আশরাফ খান উজ্জ্বল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here