ব্রজেন দাস বিক্রমপুরের সন্তান (ভিডিওসহ)

brojen-dasমোহাম্মদ সেলিম:

ব্রজেন দাস বিক্রমপুরের সন্তান। ব্রজেন দাস একজন বাঙালি সাতারু হিসেবে বিশ্বব্যাপি পরিচিতি লাভ করেন। ব্রজেন দাস প্রথম দক্ষিণ এশিয়ায় সাঁতার কেটে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার সুভাগ্য অর্জন করেন। সেই মহান দিনটি ছিল ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ আগস্ট।

mnews-eid-wishব্রজেন দাস মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার কুচিয়ামোড়া গ্রামে ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে ৯ ডিসেম্বর জন্ম গ্রহণ করেন। কুচিয়ামোড়া গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে ব্রজেন দাস ঢাকার কে এল জুবিলি হাই স্কুল থেকে ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে এসএসসি পাশ করেন। পরবর্তীতে তিনি কলিকাতার বিদ্যা সাগর কলেজ থেকে এইচএসসি ও বিএ পাস করেন। ছেলেবেলা থেকেই সাঁতারে তার দারুণ উৎসাহ ছিল। ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে ব্রজেন দাসের সাঁতারে হাতে খড়ি হয়।

শিক্ষা জীবন শেষে কলিকাতা থেকে ব্রজেন দাস ঢাকায় ফিরে আসেন। এরপর তিনি পূর্ব পাকিস্তান ক্রীড়া ফেডারেশনকে বার্ষিক সাঁতার প্রতিযোগিতা চালু করতে উদ্বুদ্ধ করেন। তারপরে ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে সাঁতার প্রতিযোগিতা প্রথম অনুষ্ঠিত হয়।

233746Kalerkantho_2017-08-18-03সেখানে দেশের উল্লেখযোগ্য প্রায় সকল সাঁতারু সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। সেই সময়ে ব্রজেন দাস নিজেকে একজন সেরা সাঁতারু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত ইংলিশ চ্যানেল সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আমন্ত্রন পান।

Brojen_dasসেই সাঁতারে অংশ নিতে ব্রজেন দাস শীতলক্ষ্যা নদী ও উত্তাল মেঘনা নদীতে কঠোর পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে সাঁতার চর্চা করেন। পরে নিজেকে সাঁতারে আরো উপযোগি করে তুলেন। এ ধারাবাহিকতায় ব্রজেন দাস নারায়ণগঞ্জ থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত সাঁতারে অংশ নেন। আর তাতেই ব্রজেন দাস ইংলিশ চ্যানেল জয় লাভের সুভাগ্য অর্জন করেন।

১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় ন্যাশনাল অলিম্পিক। এই অলিম্পিকে সাঁতারে ১০০ মিটার ফ্রি স্টাইলে প্রথম হন সাঁতারু ব্রজেন দাস। ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তান অলিম্পিকে ব্রজেন দাস ১০০ ও ৪০০ মিটার ইভেন্টে প্রথম হন।

download (1)সেই সময়ে ব্রজেন দাসকে কেন্দ্র করে প্রথমবারের মতো চ্যানেল ক্রসিং কমিটি নামে নতুন কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যথাক্রমে ক্রীড়া সংগঠক ব্যক্তিত্ব প্রকৌশলী মাইনুল ইসলাম ও এস এ মহসিনকে করা হয়।

কমিটিতে আরো যাঁরা ছিলেন তারা হচ্ছেন সাংবাদিক এ বি এম মূসা, ক্রীড়া সাংবাদিক ও সংগঠক এস এ মান্নান নাডু, সংগঠক মো. শাহজাহান, নূর হোসেন, মোল্লা আবদুল মজিদ, কাজী শামসুল ইসলাম, এফ এ করিম। যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমানকে এ কমিটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক করা হয়।

images১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রমে সাঁতার প্রতিযোগিতায় মোট ২৩টি দেশ অংশ নেয়। সেখানে তৎকালিন পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন ব্রজেন দাস। ১৯৫৮ সালের ১৮ই আগস্ট প্রায় মধ্যরাতে ফ্রান্সের তীর থেকে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। প্রচন্ড প্রতিকূল পরিবেশে সাঁতার কেটে পরের দিন বিকেল বেলায় প্রথম সাঁতারু হিসেবে ইংল্যান্ডের তীরে এসে পৌঁছান ব্রজেন দাস।

ব্রজেন দাস একাধিকবার ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেন। ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে। ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে। ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে। ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে। তারমধ্যে উল্লেখ যোগ্য হচ্ছে ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে। এদিন ১০ ঘণ্টা ৩৫ মিনিটে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ব্রজেন দাস বিশ্ব রেকর্ড করেন। এর আগে ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে মিশরের হাসান আব্দুল রহিম ১০ ঘণ্টা ৫০ মিনিটে দূরত্ব অতিক্রম করে বিশ্ব রেকর্ড করে ছিলেন। ব্রজেন দাস সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন বিশ্ব রেকর্ড করেন। ব্রজেন দাস ছয়বার চ্যানেল অতিক্রম করেছেন এটাও একটা বিশ্ব রেকর্ড। তার আগে চার বারের বেশি কেউ এই চ্যানেল অতিক্রম করেনি।

download (3)১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্বরেকর্ড সৃষ্টির পর ইংল্যান্ডে পাকিস্তান হাইকমিশনে ব্রজেন দাসকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এই সংবর্ধনায় ব্রিটিশ ভারতের সর্বশেষ গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্ট বেটেন উপস্থিত ছিলেন। ইংল্যান্ডের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ব্রজেন দাসকে কৃতিত্বের জন্য অভিনন্দন জানান।

ব্রজেন দাস ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিম বঙ্গে ১০০ মিটার ফ্রি স্টাইল সাঁতার প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হন। পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতায় ১০০, ২০০, ৪০০, ও ১৫০০ মিটার ফ্রি স্টাইল সাঁতারে তিনি ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে থেকে ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত পর পর ৪ বছর চ্যাম্পিয়ন হন। এছাড়া ব্রজেন দাস ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তান জাতীয় প্রতিযোগিতায় ১০০ ও ৪০০ মিটার ফ্রি স্টাইল সাঁতারে শিরোপা লাভ করেন। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে ব্রজেন দাস অলিম্পিক গেমসে পাকিস্তান সাঁতার দলের প্রতিনিধিত্ব করেন।

images (8)ব্রজেন দাস ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে ইতালির কাপ্রি দ্বীপ হতে নাপোলি পর্যন্ত ৩৩ কিলো মিটার দূর পাল্লার সাঁতারে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। একই বছর আগস্ট মাসে তিনি ইংল্যান্ডে বিলি বাটলিনের চ্যানেল ক্রসিং প্রতিযোগিতায় ২৩টি দেশের ৩৯ জন সাঁতারুকে হারিয়ে প্রথম স্থান লাভ করেন। ব্রজেন দাস ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে আগস্ট মাসে ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ড পর্যন্ত ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেন।

সেপ্টেম্বরে ব্রজেন দাস ইংলিশ চ্যানেলে ইংল্যান্ড হতে ফ্রান্সে সাঁতার কেটে পার হন। ১৯৬০ ও ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দের আগস্টে ব্রজেন দাস ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ডে সাঁতার কাটেন। ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে সেপ্টেম্বরে ব্রজেন দাস ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ডের মধ্যে ইংলিশ চ্যানেলে সবচেয়ে কম সময়ের মধ্যে মাত্র ১০ ঘণ্টা ৩০ মিনিটে তখনকার দিনে বিশ্ব রেকর্ড গড়েন।

ব্রজেন দাস একাধিক বার জাতীয় পুরস্কার পান। সেগুলো হচ্ছে ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার। ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে প্রাইড অফ পারফরম্যান্স। তিনি ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দের ১লা জুনে মৃত্যু বরণ করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here